default-image

মাদারীপুরের কালকিনি পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ায় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের অর্ধশত বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিভাগদী এলাকায় আওয়ামী লীগের বিজয়ী মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা এ হামলা চালান। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, গত ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত কালকিনি পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ মেয়র প্রার্থী মসিউর রহমানকে সমর্থন করে ভোট দেন বিভাগদী এলাকার হাওলাদার বাড়ির লোকজন। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী হন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এস এম হানিফ। নৌকায় ভোট না দেওয়ার প্রার্থীর সমর্থকেরা প্রতিপক্ষের বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। বাধা দিতে গেলে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় ‘বিদ্রোহী’ মেয়র প্রার্থী মসিউর রহমানে মুঠোফোনে কল করেন তৎকালীন মাদারীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মাহবুব হাসান। তাৎক্ষণিক সেখানে কালকিনি থানার ওসি নাছিরউদ্দিন গাড়ি নিয়ে হাজির হন। পরে সেখান থেকে তাঁকে পুলিশের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপরই নিখোঁজ হন মসিউর। নিখোঁজের ১১ ঘণ্টা পর কালকিনি পৌরসভার দক্ষিণ কৃষ্ণনগরের নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন মসিউর রহমান।

এর পরপরই আলোচনায় উঠে আসে কালকিনি পৌরসভা নির্বাচনের বিষয়টি। পরে নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক না থাকায় স্থগিত হয় চতুর্থ ধাপের এই নির্বাচন। এরপর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। প্রার্থীকে তুলে নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা থাকায় পরে জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান ও কালকিনি থানার ওসি নাসির উদ্দিন মৃধাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। পরে ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় কালকিনি পৌরসভার আলোচিত এই নির্বাচন।

বিজ্ঞাপন
আমার স্বামী নাই। দুই মাইয়া লইয়া একটা কুট্টি ঘরে থাহি। রাইতে দৈত্যরা আমার ঘরডাও ভাইঙ্গা হালাইছে। আমরা তো কোনো দোষ করি নাই। কারও নির্বাচনও করি নাই। তাহলে আমাগো ওপর এমন জুলুম ক্যা?
ক্ষতিগ্রস্ত মোনায়ারা বেগম

পুলিশ, স্থানীয় ও ক্ষতিগ্রস্তরা জানায়, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ মনোনীত বিজয়ী প্রার্থী এস এম হানিফের সমর্থকদের হামলার ভয়ে এলাকা ছাড়েন মসিউর রহমানের সমর্থকেরা। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে মসিউরের সমর্থক সাইদুল হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি ঢাকা থেকে নিজ এলাকা বিভাগদীতে আসেন। রাতে এশার নামাজ আদায় করতে মসজিদে গেলে সেখানে সাইদুলের সঙ্গে নৌকার সমর্থক আউয়াল সরদারের কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে আউয়াল সরদারের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিভাগদী এলাকায় সাইদুলের বাড়িঘরসহ হাওলাদার বাড়ির অর্ধশত বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এ সময় হামলাকারীদের বাধা দিতে গেলে আহত হয় নারীসহ অন্তত ১০ জন। পরে খবর পেয়ে রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

default-image

ক্ষতিগ্রস্ত সরোয়ার হাওলাদার বলেন, ‘আমরা কেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর নারিকেলগাছ মার্কায় ভোট দিলাম এডাই আমাগো অপরাধ। আমি বয়স্ক মানুষ। হামলাকারীগো কইলাম এমন কইরেন না। কিন্তু তারা থামল না। ভাঙচুর করে চইলা গেল।’

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নার্গিস বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে নিয়ে ঘরে ঘুমানো ছিলাম। লোকমান সরদার, আওয়াল সরদার, দেলোয়ার ব্যাপারীসহ ২০-৩০ জন লোক ঘরে এসে আমাদের সব ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলে। ঘরের আলমারি ভেঙে টাকাপয়সা সোনাদানা যা ছিল সব লুট নিয়ে গেছে। পরে ওরা ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে গেলে হাত-পা জড়িয়ে ধরি।’ আরেক ক্ষতিগ্রস্ত মোনায়ারা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী নাই। দুই মাইয়া লইয়া একটা কুট্টি ঘরে থাহি। রাইতে দৈত্যরা আমার ঘরডাও ভাইঙ্গা হালাইছে। আমরা তো কোনো দোষ করি নাই। কারও নির্বাচনও করি নাই। তাহলে আমাগো ওপর এমন জুলুম ক্যা?’

পরাজিত মেয়র প্রার্থী মসিউর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভাগদী এলাকায় যারা হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে, তারা হয়তো আমাকে ভালোবেসে ভোট দিয়েছে। কারণ, আমি নিজে আওয়ামী লীগ করি তারাও সবাই আওয়ামী লীগ করে। যারা হামলাকারী তারাও তো আওয়ামী লীগ করে। আর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তো জয়ী হয়েছে। এরপরও কেন এমন হামলা ঘটনা ঘটবে?’ বর্তমান মেয়র, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা বিষয়টি নজরে নিলে এমন সহিংসতা ঘটত না বলে মনে করেন তিনি।

default-image

অভিযোগের বিষয়ে কালকিনি পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র এস এম হানিফ বলেন, ‘হামলার ঘটনা আমি শুনেছি। ওই এলাকায় কেন এমন হামলা হচ্ছে, বুঝতেছি না। হয়তো ওই এলাকার মানুষের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে হতে পারে। তবে অনেকেই বিষয়টি নির্বাচনের পরবর্তী সহিংসতার দিকে চাপাচ্ছে। আমি এখন নির্বাচিত মেয়র। ওই এলাকায় কেন এমন হচ্ছে, বিষয়টি আমাকে দেখতে হবে। ওই এলাকায় আমি নিজেও যাব।’

কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইশতিয়াক আশফাক রাসেল প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ খবর শুনেই ঘটনাস্থলে যায়। পরিস্থিতি এখন শান্ত। হামলার ঘটনায় কিছু ঘরবাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো থানায় কোনো অভিযোগ দেয়নি। তা ছাড়া যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তারা এলাকায় নেই। তাদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন