২০১৮ সালে কুমিল্লার কাগজ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ আহসানুল কবীরের লেখা কুমিল্লার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থে সেকালের কুমিল্লা শহরের বাড়িঘরের চিত্র বর্ণনা করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ১৪৫৮ সালের আগ থেকেই এই শহরে মানুষের বসতি ছিল। ১৭৯০ সালে ত্রিপুরা জেলা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর সেটি আরও বিকশিত হয়। ১৮৮৫ সালে ফ্রান্সিস হেনরি স্ক্রাইন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তখন কুমিল্লা শহরে বসবাসযোগ্য একটি অবয়ব দাঁড়িয়ে যায়। তখন শহরের বজ্রপুর, মনোহরপুর, দারোগা বাড়ি ও মুন্সেফ বাড়িতে অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতেন। তখন রাজগঞ্জ মোড় থেকে কান্দিরপাড় সড়কটি ছিল সরু। এটি ছিল শহরের অন্যতম প্রধান সড়ক। এই সড়কের দক্ষিণ পাশে বাড়িঘর ওঠে। এর বেশির ভাগই সেমিপাকা। নগরের বজ্রপুর এলাকায় জানু মিয়ার বাড়ি, চর্থা এলাকার দ্বিতলবিশিষ্ট বশরত উল্লার নবাববাড়ি, সৈয়দ বাড়ি, উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ শচীন দেব বর্মনের বাবা কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান নবদ্বীপ কুমার বর্মনের বাড়ি, কুমিল্লা জজকোর্টের পাশে ১৭ একর জায়গা নিয়ে পিয়ারে যোসেফ ডেলনিদের বাড়ি, নাসির উদ্দিনের মুন্সীবাড়ি, আলা সাহেবের (বর্তমানে সদর হাসপাতাল) বাড়ি, ভাষাসৈনিক অজিত গুহের বাড়ি, বজ্রপুর এলাকার কুমিল্লা জেলা প্রথম গ্র্যাজুয়েট মোহিনী মোহন বর্ধনের বাড়ি, নানুয়ার দিঘির উত্তর পাড়ে জমিদার অঙ্গন নাহার বাড়ি, ইউসুফ হাইস্কুল এলাকার উপেন মিত্রের বাড়ি, রেয়াজউদ্দিনের দারোগা বাড়ি, ইব্রাহিম হোসেনের মুন্সেফ বাড়ি, সোনা রং কম্পাউন্ড, রানি জাহ্নবী দেবী, মনোহরপুর এলাকার ইন্দুভূষণ দত্তের বাড়ি, তালপুকুর পাড় এলাকায় অধ্যাপক সুধীর সেন বাড়ি, রানির বাজার এলাকায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ চন্দ্র রায়ের বাড়ি, তাঁর পাশে গুরুদয়াল সিংহ বাড়ি, নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকায় ছিল বসন্ত কুমার মজুমদার, শ্যাম চাঁদ ক্ষেত্রী, ইন্দ্র কুমার সেন, ভূধর দাস গুপ্তের বাড়ি, বাগিচাগাঁও এলাকায় নবাব সিরাজুল ইসলামের বাড়ি, লাকসাম সড়কের মহেশ ভট্টাচার্য, কুমিল্লা টাওয়ার এলাকার অখিল দত্ত ও কামিনী কুমার দত্তের বাড়ি, কুমিল্লা শহরের গোবিন্দপুর এলাকার কাজী মনসুরুল হকের বাড়ি। এসব বাড়ির বেশির ভাগই ছিল সেমিপাকা। কোনোটি দোতলা ও কারুকাজময়। কোনোটি একতলা। বাড়ির ভেতরে পুকুরও ছিল। গাছপালায় ভরা ছিল। তখন শহরের প্রধান সড়কের পাশে হারিকেনের আলো জ্বলত। ১৯২৯ সালে কুমিল্লা শহরে প্রথম বিজলি বাতি লাগানো হয়। এরপর থেকে কুমিল্লা শহরে মানুষের বসবাস বাড়তে লাগল। তখন কুমিল্লায় সরকারি দাপ্তরিক কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে মানুষের বসতি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তখন বায়ু ছিল নির্মল, মানুষ ছিল শান্তশিষ্ট ও পরমতসহিষ্ণু। নদীপথে মানুষ গ্রাম থেকে এসে ব্যবসা করত। ব্যবসা ও পড়তে এসে স্থাপনা তৈরি ও বিভিন্ন বাসাবাড়িতে থাকা শুরু করে।

কুমিল্লার তত্কালীন জেলা সার্ভেয়ার জে জে কামিন্স তাঁর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ১৮৬৪ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লা পৌরসভা হয়। ১৮৬৫ সালে কুমিল্লা শহরে পাকা বাড়ি ছিল ২৪টি। ১৮৮১ সালে শহরের লোকসংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৩৭২ জন ও ১৮৯১ সালে ১৪ হাজার ৬৮০ জন। ১৮৯৫ সালে ৫৫টি পাকা বাড়ি ছিল।

২০০৬ সালে কুমিল্লা শহরের লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ। ঘরবাড়ি ছিল ২৮ হাজার ২২টি। সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। বাড়ির সংখ্যা ৩৮ হাজার ৮৩২টি।

আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সেল স্ট্রাকচারাল লিমিটেড, গোল্ড সিলভার হোমস লিমিটেড, এমআরসি বিল্ডার্স লিমিটেড, মরিয়ম বিল্ডার্স লিমিটেড, এভারগ্রিন, রূপায়ন, স্বর্ণ কুটির ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড, স্বর্ণ কুটির প্রপার্টিজ প্রাইভেট লিমিটেড, ঠিকানা টাওয়ার, জমজম, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভবন করছে।

নগরের তালপুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা সুখেন চন্দ্র সাহা (৮৫) বলেন, ‘সেকালের (১৯৫৪ সাল) কুমিল্লা শহরে মানুষের বসতি আমার মতে ৫০ হাজারের বেশি ছিল না। মানুষ ৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। তখনো বাড়ি বাড়ি হারিকেনের আলো জ্বলত। কাঠের, শণের, টিনের ও মাটির ঘর ছিল শহরের বিভিন্ন স্থানে।’

নগরের বাদুরতলা এলাকার বাসিন্দা আইনজীবী দিলীপ কুমার পাল (৮০) বলেন, ‘আমাদের পাড়াতেই চারটি খেলার মাঠ ছিল। পুকুর ছিল। তখনকার কুমিল্লা শহর দেখতে বাইরে থেকে মানুষ আসতেন। এখন এগুলোর মধ্যে বহুতল স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এত সুন্দর শহর এখন ইট–কংক্রিটে ভরা।’

২০০৯ সালে কুমিল্লা শহরে ১৮ শতক জায়গার ওপর প্রথম ১৩ তলা বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয় কুমিল্লা জিলা স্কুলের বিপরীত পাশে। সমতট ল্যাগাসি নামের ওই ভবন নির্মাণ করেন ১০ জন মিলে। একসঙ্গে একই ভবনে বহু পরিবার থাকার প্রথম ভবন এটি। ভবন নির্মাণের অন্যতম উদ্যোক্তা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘জায়গাটি কেনার পর আমরা প্লট করে বিক্রি করতে চেয়েছিলাম। হঠাৎ করে মনে হলো, নিজেরা ভবন করে ফ্ল্যাট বিক্রি করলে কেমন হয়? এরপর আমরা কাজ শুরু করি। একপর্যায়ে ভবনটি দাঁড়িয়ে যায়। এরপর থেকে কুমিল্লা নগরে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়। বিভিন্ন আবাসন কোম্পানি বিনিয়োগ করে। গত এক যুগে শহরে প্রচুর বহুতল ভবন হয়েছে।’

কুমিল্লা নগরে গত এক দশকে অন্তত ৪০টির মতো আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বহুতল ভবন করেছে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে কেন্দ্র করে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সেল স্ট্রাকচারাল লিমিটেড, গোল্ড সিলভার হোমস লিমিটেড, এমআরসি বিল্ডার্স লিমিটেড, মরিয়ম বিল্ডার্স লিমিটেড, এভারগ্রিন, রূপায়ন, স্বর্ণ কুটির ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড, স্বর্ণ কুটির প্রপার্টিজ প্রাইভেট লিমিটেড, ঠিকানা টাওয়ার, জমজম, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভবন করছে। নগরের রানির দিঘির পাড়, নানুয়ার দিঘির পাড়, উজির দিঘির পাড়, বাগিচাগাঁও, ঝাউতলা, কান্দিরপাড়, মনোহরপুর, রাজগঞ্জ, ধর্মপুর, অশোতকলা, রেসকোর্স, টমছমব্রিজ, ঠাকুরপাড়া, বাদুরতলা, আদালতপাড়া এলাকায় বিশাল অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনায় হাজার হাজার ফ্ল্যাটবাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন মিলে জায়গা কিনে বহুতল ভবন করছেন।

নগরের রানির দিঘির পাড়ে ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এন এম রবিউল আউয়াল চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘নগরে আমার বিশাল জায়গা আছে। কিন্তু বাড়ি করার মতো টাকা নেই। তাই রানির দিঘির পাড় এলাকায় ফ্ল্যাট কিনে থাকছি। ফ্ল্যাটে ভালোই লাগছে।’

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. সফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ২০১১ সালের পর হু হু করে বহুতল ভবন গড়ে ওঠে। এই সময়ে অন্তত ১ হাজার ৮৫১টি বহুতল ভবন হয়। এর মধ্যে কান্দিরপাড়ে ১৫তলা ভবনও হয়েছে। আরও কয়েকটি বহু ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। যত্রতত্রই ভবন হচ্ছে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হলে পরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরি করা যেত।

নগরের সবচেয়ে বড় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গোল্ড সিলভার হোমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ বলেন, মানুষের উপার্জন ক্ষমতা বেড়েছে। ঝক্কিঝামেলা এড়াতে একসঙ্গে থাকার জন্য মানুষ ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকছেন। আধুনিক নির্মাণশৈলীর কারণে মানুষ বহুতল ভবনে থাকছেন। করোনা না থাকলে এটা আরও বিকশিত হতো।

কুমিল্লার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আমীর আলী চৌধুরী (৮৫) বলেন, প্রাচীনকালে নগরের পূর্বাঞ্চল এলাকায় ঘনবসতি ছিল। এসব এলাকায় মানুষের বসতি ছিল। নদীপথে চকবাজার এসে নৌকা ভিড়ত। এই এলাকা ব্যবসাকেন্দ্র ছিল। এ ছাড়া কান্দিরপাড় এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর শাখাখাল কান্দি খালে এসে নৌকা ভিড়ত। তখন কান্দিরপাড়-রাজগঞ্জ রাস্তা ছিল চকবাজার পর্যন্ত। ১৯৫০ সালের দিকে মানুষ ৫০ থেকে ৬০ টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকত। ১৮৪২ সালে আমাদের মৌলভীপাড়াতে তিনতলা একটি ভবন ছিল। এখন আর সেটি নেই। নানুয়া দিঘির দক্ষিণ পাড়ে রমেশ কুটির ছিল। উত্তর পাড়ে অঙ্গন নাহার বাড়ি ছিল। মৌলভীপাড়ায় আমাদের বাড়িতে সপ্তম জেনারেশন রয়েছে। সৈয়দ বাড়িতে ষষ্ঠ জেনারেশন, নবাববাড়িতে পঞ্চম, দারোগা বাড়ি, মুন্সী বাড়ি, মুন্সেফ বাড়ি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি রয়েছে। হিন্দুদের বাড়িগুলোর এখন আর সেইভাবে নেই। এগুলো হাতবদল হয়ে বহুতল ভবন হয়েছে। কেউ বিক্রি করেছেন। কারও কারও বাড়ি ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে আছে।’

আমীর আলী চৌধুরী আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হওয়ার পর বাড়িঘর তুলতে কঠোরতা দেখানো হয়নি। যে কারণে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন হয়েছে। মহাপরিকল্পনা নিয়ে করলে বাড়িগুলো সুন্দর হতো। এখন একটা শ্রেণির মানুষের হাতে টাকাপয়সা আছে। তাঁরা উন্নত জীবনযাপনের জন্য ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকছেন। সর্বত্রই আধুনিকতার ছোঁয়া। এক ভবনে শত শত মানুষ থাকছেন। কিন্তু খোলামেলা পরিবেশ তো নেই।’

মেয়র মো. মনিরুল হক বলেন, ‘বহুতল ভবন হওয়ার কারণে পুরো কুমিল্লা নগরের চেহারা পাল্টে গেছে। আমার কাছে বিষয়টি খুবই ভালো লাগছে। ওপর থেকে কুমিল্লা শহরকে সুন্দর লাগছে। এখন এই নগরীকে একটা বড় শহরের মতো মনে হচ্ছে। কুমিল্লা এখন সম্পূর্ণ একটি আবাসিক শহর। মানুষ এই শহরে শান্তিতে নিরাপদে বসবাস করছে। আগের চেয়ে পুরো শহরকে আধুনিক লাগছে।’