default-image

শাশুড়ির করা শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মামলায় বগুড়া শহরের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন রানা এবং তাঁর স্ত্রী আকিলা সরিফা সুলতানাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রোববার বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন নিতে গেলে বিচারক জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে তাঁকে সস্ত্রীক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আনোয়ার হোসেন নন্দীগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য। তিনি বগুড়া শহরের নওয়াববাড়ি সড়কের দেলওয়ারা-শেখ সরিফ উদ্দিন সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতি, জেলা বিড়িশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি এবং বগুড়া জেলা দোকানমালিক ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব। এ ছাড়া তিনি বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুক্তজমিন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক।

বিজ্ঞাপন

আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া সদর থানায় ৫ অক্টোবর শাশুড়ি দেলওয়ারা বেগমের করা শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মামলায় আসামি করা হয় আনোয়ার হোসেন, তাঁর স্ত্রী আকিলা সরিফা সুলতানা, বাদীর মালিকানাধীন সরিফ বিড়ি ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম, সরিফ সিএনজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক হাফিজার রহমান ও দেলওয়ারা-শেখ সরিফ উদ্দিন সুপারমার্কেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলামকে। এর মধ্যে প্রধান আসামি আনোয়ার হোসেন ও তাঁর স্ত্রী আকিলা সরিফা সুলতানা ১১ অক্টোবর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। হাইকোর্ট চার সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁরা দুই সপ্তাহের মাথায় আজ রোববার বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে স্থায়ী জামিন প্রার্থনা করেন। আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রবিউল আওয়াল আবেদন না মঞ্জুর করে আনোয়ার হোসেন ও তাঁর স্ত্রী আকিলা সরিফা সুলতানাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

শতকোটি টাকা আত্মসাতের মামলা
বাদী দেলওয়ারা বেগম বগুড়ার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী প্রয়াত শেখ সরিফ উদ্দিনের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর দেলওয়ারা বেগম সব ব্যবসা ও শিল্পকারখানা পরিচালনা করে আসছেন। বর্তমানে তিনি বগুড়ার চারমাথা ও শাকপালা এলাকায় অবস্থিত সরিফ সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেড-১ ও ২ এবং দেলওয়ারা-শেখ সরিফ উদ্দিন সুপারমার্কেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সরিফ বিড়ি ফ্যাক্টরির অন্যতম মালিকও তিনি। আনোয়ার হোসেন দেলওয়ারা বেগমের বড় মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানার দ্বিতীয় স্বামী।
৫ অক্টোবর বগুড়া সদর থানায় হওয়া মামলায় বাদী দেলওয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তাঁর জামাতা আনোয়ার হোসেন ও বড় মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা তাঁর সব প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতেন। ব্যবসার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেন। বিভিন্ন সময় লাইসেন্স করা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফাঁকা স্ট্যাম্প, এফডিআর ও ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর নেন আনোয়ার। এসব কথা বাইরে জানালে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দিতেন। এভাবে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি থেকে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫০ কোটি টাকার এফডিআর এবং বিভিন্ন ব্যাংকের কয়েকটি হিসাব থেকে আরও ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর মেয়ে-জামাই দুজনই বাড়ি ছেড়ে গা ঢাকা দেন। অন্য আসামিরা আনোয়ার হোসেনকে এ অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর মামলাটি ৫ অক্টোবর রেকর্ড করা হয়। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।

বিজ্ঞাপন

আনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ
আনোয়ার হোসেন রানার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তাঁর চার শ্যালিকা মাহবুবা খানম, নাদিরা শরিফা সুলতানা খানম, কানিজ ফাতেমা পুতুল ও তৌহিদা শরিফা সুলতানা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, আকিলা সরিফা সুলতানার আগের স্বামী ও দৈনিক দুর্জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদক সাইফুল ইসলামের নামে লাইসেন্স করা রিভলবারের লাইসেন্স অবৈধভাবে মালিকানা পরিবর্তন করে নিয়েছেন আনোয়ার। এখন একটি শটগান ও একটি রিভলবার ব্যবহার করছেন তিনি। এসব আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তিনি শাশুড়ি দেলওয়ারা বেগমকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শতকোটি টাকা হাতিয়েছেন। যেখানে-সেখানে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো প্রদর্শন ও বডিগার্ড ব্যবহার করছেন।

সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নামে পাল্টা অভিযোগ
আনোয়ার হোসেন ও তাঁর স্ত্রী আকিলা সরিফা সুলতানার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে বগুড়া শহরের সেখ সরিফ উদ্দিন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা শহরের সাতমাথায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছেন। এ ছাড়া নন্দীগ্রাম শহরেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশ থেকে মামলাকে পুরোটা ষড়যন্ত্র বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে আনোয়ারের তিন ভায়রা ছাড়াও বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের বিএনপিদলীয় সাংসদ মোশারফ হোসেন, নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান রেজাউল আশরাফ এবং এলাকার একজন বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষককে দায়ী করা হয়।
তবে আনোয়ারের ভায়রা মোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা কোনো প্রতিহিংসা বা কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়। আমার শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি সব মেয়ে সমান পাওয়ার কথা। কিন্তু আনোয়ার হোসেন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একাই তা ভোগ করতে চান।’
সাংসদ মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, একজন মা কতটা অতিষ্ঠ হলে নিজের মেয়ে আর জামাতার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। এটা একান্ত পারিবারিক বিষয়। এখানে কোনো রাজনীতি নেই। তাঁর শাশুড়িকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে রাজনীতি টেনে এনে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মন্তব্য পড়ুন 0