default-image

চার বছর আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনা ছাত্রী হলের ১০ তলা ভবন ও ড. ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ১০ তলা ভবনের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে ‘স্বাধীনতা স্মারক’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভবনগুলো এখনো অর্ধেকও হয়নি। প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ ওই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সরেজমিন তদন্ত কমিটি। এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওই কমিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের নানা অসংগতি নজরে এলে ইউজিসিকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর গত বছরের ২০ এপ্রিল ইউজিসির সদস্য মুহাম্মদ আলমগীরকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক (বর্তমানে সচিব) ফেরদৌস জামান এবং ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক দুর্গা রানী সরকার। তদন্ত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি স্থাপনা নির্মাণে অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি অবকাঠামো নির্মাণে যে অবহেলা, দীর্ঘসূত্রতা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা বর্তমান প্রশাসনের অনৈতিকতা, অদক্ষতা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছা–অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং শিক্ষা গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রধান এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকার জন্য বর্তমান উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর এই দায়দায়িত্ব অবশ্যই বহন করা উচিত। একই সঙ্গে ইউজিসির তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ভবনের নকশা পরিদর্শন করে যেভাবে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে নিয়োগকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা না করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যা সরকারি ক্রয় পদ্ধতিবহির্ভূত বলে কমিটি মনে করে। এ ধরনের অনৈতিক কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখানে দ্বিতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রহণযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ ডিজাইন অনুমোদন করেছেন উপাচার্য।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসির পরিচালক ও তদন্ত কমিটির সদস্য ফেরদৌস জামান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গত জানুয়ারি মাসে ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে। তদন্তের অনুসন্ধান নিয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

default-image

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ছাত্রীদের আবাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নামে শেখ হাসিনা হলের ১০ তলা ভবন নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৬ সালের ২১ জুলাই। কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি। এর ব্যয় ধরা হয় ৪৮ কোটি ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি। বাস্তবে এই হলের কাজ পাঁচতলার ছাদ পর্যন্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ও প্রধানমন্ত্রীর স্বামীর নামে প্রতিষ্ঠিত ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের জন্য একটি ভবন নির্মাণের জন্য চুক্তিমূল্য দেওয়া হয় ২৫ কোটি ২৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এ ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৬ সালের ২১ জুলাই। কাজ শুরু করা হয় ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি এবং কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট। কিন্তু বাস্তবে ১০ তলা ভবনের কেবল ৫ তলার ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে কেবল ছাদ আর কাঠামোটাই তৈরি হয়েছে, কোনো কক্ষ করা হয়নি। এখন দুটি ভবনেরই নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ ছাড়াবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

২০১৭ সালে প্রকল্পের কাজ উদ্বোধনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক এ কে এম নূর উন নবী। ওই বছরেরই ১৪ জুন নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে এসব উন্নয়নকাজ তদারকি করার জন্য উপাচার্যের ঘনিষ্ঠজন প্রকৌশলী মঞ্জুর কাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস কমিটির সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেমে থেমে খুব ধীরে কাজ এগিয়েছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভবনের কাজ বন্ধ দেখা গেছে।

ভবনের কাজ ধীরগতির কারণে চুক্তিমূল্যের চেয়ে বর্তমানে দ্বিগুণ টাকা ব্যয় হচ্ছে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, কাজের গতি ধীর হলে তো টাকার পরিমাণও বেড়ে যাবে।

উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ নতুন করে নকশা অনুমোদন দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘প্রতিবেদনটি আমি দেখিনি। এটা (ভবনটি) আগের উপাচার্যের আমলেই ফাউন্ডেশন হয়েছে। তারপর তো আর আমি পরিবর্তন করতে পারি না।’

ভবন নির্মাণে অনিয়ম চলমান থাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ইউজিসির তদন্ত কমিটির সুপারিশে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘এ প্রতিবেদন প্রসঙ্গে আমার জানা নেই।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন