বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রোজিনার মতো এমন ৮৯ জন অসহায় ও কর্মহীন নারীকে চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের পক্ষ থেকে কিনে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। কাউকে কাউকে কিনে দেওয়া হয়েছে হাঁস-মুরগি। কেউ কেউ পেয়েছেন ছোট দোকান। এভাবে অসহায়দের জীবিকার ব্যবস্থা করা ছাড়াও মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করে চলো স্বপ্ন ছুঁই।

একটি বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছে সংগঠনটি। তা হলো নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রংপুর মহানগরের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁর শৌচাগারে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বাক্স স্থাপন করা। সংগঠনের মেয়েরা গ্রামে গিয়ে দরিদ্র নারীদের মধ্যেও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেন।

চলো স্বপ্ন ছুঁই রংপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। অন্য সংগঠনের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এটি চলে সদস্যদের নিজস্ব অনুদানে। সদস্যসংখ্যা ৪৫০। সবাই স্কুল, কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। সংগঠনটির নেতারা জানান, সদস্যরা শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে (টিউশনি করে) যে আয় করেন, সেখান থেকে প্রতি মাসে কিছু অংশ জমা দেন সংগঠনের তহবিলে। তাঁরা শপথ করে নিজেদের জন্মদিন পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে বাবদ ব্যয় না করে টাকা মানুষের সহায়তার জন্য দান করেন। অনেকের মা-বাবা নিজেদের বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান না করে সাশ্রয় করা অর্থ দেন মানবসেবায়।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী গ্রামের আনিকা তাবাচ্ছুম ঢাকার সরকারি ইউনানি অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি একজনকে পড়িয়ে মাসে তিন হাজার টাকা পান, সেখান থেকে প্রতি মাসে সংগঠনকে দেন ৩০০ টাকা। আনিকা তাবাচ্ছুম বলেন, ‘টাকাটা দিতে পারলে মনটা ভরে যায়।’

যেভাবে শুরু

চলো স্বপ্ন ছুঁই ২০১৮ সালে রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় ৩০ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এর উদ্যোক্তা ও বর্তমান সভাপতি পীরগাছা উপজেলার বড়পানসিয়া গ্রামের মুহতাসিম আবশাদ জিসান (২২)। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। মুহতাসিম প্রথম আলোকে বলেন, ২০১২ সালে তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৮ সালে বন্ধুদের নিয়ে নিজেই গড়ে তোলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চলো স্বপ্ন ছুঁই।

পীরগাছার গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে রংপুরের আট উপজেলাসহ লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও জেলায় চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মুহতাসিম জানান, তিনি এখন একজনকে পড়িয়ে মাসে দুই হাজার টাকা পান। তার এক হাজার টাকা সংগঠনের তহবিলে জমা দেন।

যত কাজ

চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের সংগঠকেরা জানান, তাঁরা অসহায় মানুষের অবস্থা বুঝে সহায়তার ধরন ঠিক করেন। ৮৯ জন নারীকে সেলাই মেশিন কিনে দেওয়ার বাইরে তাঁরা ২১৫টি অসহায় পরিবারকে কিনে দিয়েছেন দুই হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি। ১৫ জনকে নগদ টাকা দিয়ে ছোট দোকান করে দিয়েছেন। মা-বাবাহীন ১৫টি শিশুর ভরণপোষণ ও পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। পাঁচজন প্রতিবন্ধীকে দেওয়া হয়েছে হুইলচেয়ার।

সংগঠনের সদস্যরা এক হাজারের বেশি নিম্ন আয়ের মানুষের বাড়ির আঙিনায় ফলদ ও বনজ গাছ রোপণ করে দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা এখন পর্যন্ত করোনায় কর্মহীন পাঁচ হাজার মানুষকে খাদ্য সরবরাহ ও সহায়তা করেছেন। বিতরণ করেছেন মাস্ক ও জীবাণুনাশক (হ্যান্ড স্যানিটাইজার)। চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের সাধারণ সম্পাদক তানজিম আলম জানান, সদস্যদের বাইরে কেউ সহায়তা করতে চাইলে তাঁরা নিজেরা তা গ্রহণ না করে সরাসরি অসহায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।

‘তাঁরা ভালো কাজ করছেন’

রেস্তোরাঁয় চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত স্যানিটারি ন্যাপকিন কি দেওয়া হয়, যাচাই করতে সম্প্রতি যাওয়া হয় রংপুর শহরের মেডিকেল মোড়ের রেস্তোরাঁ দ্য কিচেন নামের একটি খাবারের দোকানে। এটির ব্যবস্থাপক আকাশ দেব বলেন, চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের সদস্যরা প্রতি মাসে ন্যাপকিন বাক্সে রেখে যান।

চলো স্বপ্ন ছুঁই ও এর উদ্যোক্তা মুহতাসিম আবশাদ বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন। রংপুরে এ সংগঠন সম্পর্কে অনেকেই জানেন। রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. ফরহাদ হোসেন ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল আলীম মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, চলো স্বপ্ন ছুঁই মানবসেবার একটি ভালো মঞ্চ। ওরা ভালো কাজ করছে।

অবশ্য চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের বড় শুভাকাঙ্ক্ষী সেই সব দরিদ্র মানুষ, যাঁরা সংগঠনটির সহায়তায় জীবিকার উপায় খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী করিমন নেছা (৭০)। তিনি মাস ছয়েক আগে এক সন্ধ্যায় রংপুর নগরের মডার্ন মোড়ে বসে কাঁদছিলেন। খবর পেয়ে চলো স্বপ্ন ছুঁইয়ের সদস্যরা তাঁকে সহায়তা করেন।

এই নারীর বসবাসের জন্য রংপুর সদরের আশরতপুর গ্রামে একটি টিনের চালাঘর তুলে দেওয়া হয়। এখন মাসে মাসে তাঁকে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি কিনে দেওয়া হয়েছে হাঁস। সম্প্রতি ওই বৃদ্ধার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি লাঠির ওপর ভর করে বের হন। পরিচয় পেয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা, আমার কোনো সাহায্য লাগবে না। প্রতি মাসে খাওয়া-পরার টাকা দেয় স্বপ্ন ছুঁই।’

দেখা গেল, অসুস্থতার মধ্যেও বৃদ্ধ করিমনের মুখে হাসি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন