কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, কুয়াকাটার প্রায় সব হোটেলমালিকেরই ব্যাংকঋণ আছে। প্রতি মাসে তাঁদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। গত দুই বছর পর্যটন ব্যবসায় ধস নামায় ধারদেনা করে কিস্তি পরিশোধ করেছেন হোটেলমালিকেরা। গত দুই বছরে হোটেল ব্যবসায় কমপক্ষে চার শ থেকে পাঁচ শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে শুঁটকি, মাছ, শামুক-ঝিনুক, খাবারের হোটেল, বিনোদন, ট্যুর অপারেটরসহ পর্যটননির্ভর অন্যান্য ব্যবসায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

মোতালেব শরীফ বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ঈদসহ নানা উপলক্ষে কুয়াকাটায় পর্যটকদের ভিড় বাড়লে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। ঈদের দিন কুয়াকাটায় পাঁচ থেকে সাত হাজার লোকের উপস্থিতি ছিল। ঈদের দ্বিতীয় দিনে উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ছে। কুয়াকাটা আবারও স্বরূপে ফিরবে, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ঈদের দিন বিকেল থেকেই কুয়াকাটায় পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকে। পর্যটকদের মধ্যে বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন প্রান্তের লোকজনই বেশি ছিল। ঈদের দ্বিতীয় দিনে আজ সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণবিলাসী মানুষ কুয়াকাটায় ছুটে আসেন। আজ কুয়াকাটার সীমা বৌদ্ধবিহার, মিশ্রি পাড়া বৌদ্ধবিহার, লেম্বুর চর, ইলিশ পার্কে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

ঢাকা থেকে আসা নাজমুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুয়াকাটায় আগেও এসেছি। এবার অনেক দিন পরে আসলাম। তবে সৈকত এলাকার পরিস্থিতি দেখে হতাশ হয়েছি। সৈকত ভেঙে ছোট হয়ে গেছে। তা ছাড়া সৈকতে নামার প্রধান সড়কটির সামনে পড়ে আছে বালুর বস্তা, ইট-কংক্রিটের ভাঙা অংশ, যা দেখতে অসুন্দর লাগছে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বালু ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় শ্রীহীন হয়ে পড়েছে সৈকত। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব ঠিক করা দরকার।’

অন্যদিকে কুয়াকাটার পূর্ব ও পশ্চিম পাশের ভাজা মাছ বিক্রির ৫০টি দোকান ছিল বেচাবিক্রিতে সরগরম। ভাজা মাছ বিক্রির পূর্ব অংশের বাজার কমিটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিটি ভাজা মাছের দোকানে বিকেল চারটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত বেচাবিক্রি হয়। দোকানিদের কেউ কেউ দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করছেন। সব মিলিয়ে ৫০টি দোকান থেকে প্রতিদিন ১৫ লাখ বেচাকেনা হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে আগামী ১০ দিন বিক্রি বেশ ভালোই হবে বলে জানান তিনি।

কুয়াকাটার বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বেচাবিক্রি ভালোই হচ্ছে। বিক্রেতারাও বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ক্রেতাদের ভিড় থাকায় খুশি বিক্রেতারা। সৈকতের রাখাইন মার্কেটের ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বলেন, দূরের মানুষ বেড়াতে এলে তাঁরা কেনেন বেশি। কিন্তু কাছের লোকজন তুলনামূলক কম কেনেন। ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ তাঁর বিক্রি ভালোই হয়েছে। তিনি ১০ হাজার টাকার মতো বিক্রি করেছেন। আগামী কয়েক দিন সরকারি ছুটি থাকায় পর্যটকদের আনাগোনা ভালো থাকবে বলে তিনি মনে করছেন।

রাখাইন মন্দির লাগোয়া শাহ আমীন গার্মেন্টসের মালিক আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি নারী-পুরুষের নানা ধরনের রাখাইন বস্ত্র বিক্রি করেন। গত দুই দিনে তিনি ভালো বিক্রি করেছেন। কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ সব খরচ মিটিয়ে তাঁর ভালো মুনাফা থাকবে।

সৈকতে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন আবদুর রহিম। সৈকত পর্যটকের আগমন ঘটলে তাঁর সংসার চলে। তিনি বলেন, ‘রোজার এক মাস বসেই ছিলাম। কোনো যাত্রী পাইনি। তার আগে করোনায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছি। ঈদের ছুটির এ সময়ে যাত্রী টেনে কূল করতে পারছি না। নাওয়া-খাওয়ারও সময় পাই না। যাত্রী টেনে গত দুই দিনে আমি আট হাজার টাকা আয় করেছি।’ সৈকতের বালু চরে ছাতা-বেঞ্চ ভাড়া দেওয়া নুর হোসেন বলেন, ‘গত দুই বছর ছাতা-বেঞ্চ বাড়িতে তুলে রেখেছিলাম। ঈদে আয়রোজগার ভালো হবে মনে করে ছাতা-বেঞ্চ এনে আবার সৈকতে বসিয়েছি। মানুষজন ভালোই আসছে, আমাদের আয়ও ভালো হচ্ছে।’

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম বাচ্চু বলেন, সাগরের জলরাশিতে বেড়ানোর জন্য লাইফবোট বুকিং হচ্ছে বেশি। এ ছাড়া স্পিডবোট, ওয়াটার বাইকেও অনেক পর্যটক সাগর উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় ঘুরছেন। এসব জলযানে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে টিকিট কাউন্টার আছে। নির্ধারিত দুটি টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটেই পর্যটকেরা লেম্বুর চর, গঙ্গামতী সৈকত, ফাতরার বন ও আশার চর ঘুরছেন।
কুয়াকাটা পর্যটন পুলিশের পরিদর্শক হাসনাইন পারভেজ বলেন, ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে তাঁরা সদা তৎপর। সৈকত ও হোটেল-মোটেল এলাকায় আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটন পুলিশের ছয়টি দল এ জন্য কাজ করছে।  

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আবাসিক হোটেল-মোটেল, খাবার হোটেলে মূল্যতালিকা টাঙানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পর্যটননির্ভর প্রতিটি সেবা খাতকে নিয়মনীতি মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কেউ যাতে পর্যটকদের হয়রানি করতে না পারে, সে জন্য সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক তৎপরতা আছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন