স্বামী-সন্তানের কথা মনে পড়ে, রাতও কাটে নির্ঘুম

বিজ্ঞাপন
default-image

বিজয়ের আনন্দে প্রতিবছর সারা দেশ মেতে থাকলেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে স্বজন হারানোর ক্ষত এখনো মনে জ্বালার সৃষ্টি করে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুরের শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হয়ে গেলেও স্বামী-সন্তানের নির্মম মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এখনো কেঁদে বুক ভাসান তাঁরা।

শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধারা স্বামী-সন্তান হত্যার বিচার পেয়েছেন। নির্যাতনের শিকার নারীরা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। ৩০ জন শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সরকারিভাবে বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার এই প্রতিবেদক সোহাগপুর গ্রামে গেলে কয়েকজন শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধা সরকারের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

কেমন আছেন জানতে চাইলেই নারী মুক্তিযোদ্ধা হাফিজা বেওয়ার বলেন, ‘আল্লাহ আমগরের ভালাই রাকছে। সরকার আমগরে ঘর কইরা দিছে, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিছে, গণহত্যার বিচার করছে।’ তবে স্বামী-সন্তানের কথা বলতেই দুই চোখ স্থির হয়ে যায় হাফিজার। টপটপ করে ঝরতে থাকে তাঁর দুই চোখ বেয়ে পানি। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে হাফিজা বলেন, ‘ওই দিনের কতা মনে অইলে অহনো রাইতে ঘুমাইবার পাই না।’

কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে ১৯৭১ সালে ২৫ জুলাই ঘটে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। হানাদার বাহিনী ও দেশীয় রাজাকারের পৈশাচিক তাণ্ডবে ১৮৭ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। সে সময় নির্যাতনের শিকার হন ১৪ জন গৃহবধূ। স্বামী হারিয়ে বিধবা হন ৬২ নারী। গ্রামটির বেনুপাড়ার সব পুরুষকে হত্যা করায় স্বাধীনতার পর পাড়াটির নাম বিধবাপল্লি নামে পরিচিতি পায়। সেদিনের বিভীষিকা নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন ২৪ জন বিধবা নারী।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে তৃতীয় অভিযোগ ছিল সোহাগপুরে হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ নিয়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

নির্যাতনের শিকার ১৪ জন নারীকে দেওয়া হয়েছে ‘নারী মুক্তিযোদ্ধার’ স্বীকৃতি। গত বছর সরকারিভাবে ৩০ জন শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধাকে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। তাঁরা প্রতি মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ভাতা পান। এ ছাড়া প্রতি মাসে বেঁচে থাকা শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধারা ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে দুই হাজার টাকা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক থেকে ৫০০ টাকা ও বিধবা ভাতা হিসেবে ৫০০ টাকা পান।

জেলা প্রশাসক আনারকলি মাহবুব ও পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী আশরাফুল আজিম শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত খোঁজখবর নেন। বিভিন্ন দিবসে তাঁদের জন্য নানা উপহারসামগ্রী নিয়ে যান তাঁরা। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে গত ফেব্রুয়ারিতে ফি মেডিকেল ক্যাম্প করা হয়। এ সময় শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওধুষ দেওয়া হয়। পুলিশের সহযোগিতায় ৩০ জনের বাড়িতে ফলের গাছ রোপণ করে দেওয়া হয়েছে। শীতের চাদর দেওয়া হয়েছে। গত মার্চে ঘাটাইল সেনাবাহিনীর উদ্যোগে সোহাগপুর গ্রামের ‘বীরকন্যাপল্লী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

সোহাগপুর বিধবাপল্লি কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন জানান, সেদিন গণহত্যায় তাঁর বাবাসহ পরিবারের সাতজন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। বেঁচে থাকা নারীদের সরকার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। তবে বয়স হওয়ায় বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধারা। সরকারিভাবে সবার চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান বলেন, সোহাগপুরের এই হত্যাকাণ্ডে ১৮৭ জন গ্রামবাসীকে প্রাণ দিয়তে হয়েছিল। সরকারের সহযোগিতায় শহীদজায়া ও নারী মুক্তিযোদ্ধারা দুই বেলা খেয়েপরে বাঁচতে পারছেন। তিনিও তাঁদের চিকিৎসার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ করেছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন