default-image

বিয়ের বছর না ঘুরতেই যুদ্ধের ডাক পড়ে। দেশমাতৃকার টানে নুরু মিয়া যুদ্ধে চলে যান। বাড়িতে ছিলেন স্ত্রী নূরজাহান বেগমসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের এলাকায় হামলা চালায়। এ সময় মর্টার শেলের আঘাতে নূরজাহান গুরুতর আহত হন। পরে দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

সম্প্রতি নূরজাহানের স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে শুরু করে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন, মস্তিষ্কে মর্টার শেলের একটি টুকরা রয়ে যাওয়ায় সেখানে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এতে তাঁর এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁদের মূল বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার আমোদাবাদ এলাকায়। বর্তমানে তাঁদের পরিবার মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের পশ্চিম গুড়াভুঁইয়ে (আয়নাছড়া মোকাম সড়ক) থাকে।

সম্প্রতি কুলাউড়ার বাসিন্দা সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনো ও স্নায়ুরোগ চিকিৎসক সাঈদ এনাম (সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি বিভাগ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ব্যাপারে একটি স্ট্যাটাস দেন। এর সূত্র ধরে এ প্রতিবেদক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে নূরজাহানের খোঁজে তাঁদের বাড়িতে ছুটে যান।
১৮ এপ্রিল সকালে পশ্চিম গুড়াভুঁইয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নূরজাহান বিছানায় বসা। স্বজনদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। তবে কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন না।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের বড় ছেলে সৌদি আরবপ্রবাসী মোবারক হোসেন বলেন, যুদ্ধের পর তাঁর জন্ম। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের মা-বাবার বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের বাবা নুরু মিয়া ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের এলাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অনেক মানুষ হতাহত হন। নূরজাহানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মর্টার শেলের আঘাত লাগে। পরে তাঁকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন তাঁর চিকিৎসা চলে। যুদ্ধ শেষে নুরু তাঁকে নিয়ে বাড়িতে ফেরেন।

মোবারক বলেন, আখাউড়াতে বাড়ির ভিটা বাদে তাঁদের আর কিছু ছিল না। অভাব-অনটনে পড়ে যুদ্ধের পর তাঁদের বাবা সেই ভিটা বিক্রি করে দেন। ১৯৭৬ সালে তাঁর বাবা কাজের সন্ধানে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে কুলাউড়ায় চলে আসেন। ভূমিহীন হিসেবে উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের লংলা খাসএলাকায় আশ্রয় নেন। সেখানে মোবারকের আরও এক ভাই ও পাঁচ বোনের জন্ম হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে তাঁর বাবা নুরু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানী ভাতা পাওয়া শুরু করেন। জমানো ভাতাসহ আরও কিছু টাকা ধারদেনা করে তাঁকে বিদেশে পাঠান। ২০১৫ সালে তিনি পশ্চিম গুড়াভুঁইয়ে কিছু জমি কিনে পাকা ঘর তুলেন। মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেখানে ওঠেন। ২০১৯ সালের ২ জুন তাঁদের বাবা মারা যান।

মোবারক আরও বলেন, আঘাতের কারণে তাঁদের মা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। এখন তা-ও পারছেন না। এ ছাড়া এত দিন তাঁর স্মৃতিশক্তি ভালোই ছিল। ১৫-২০ দিন আগে হঠাৎ স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে। এরপর চিকিৎসক সাঈদ এনামের চেম্বারে নিয়ে যান। তাঁর পরামর্শে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যে দুই-একটি কথা বলেন। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাবেন।

আখাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বাহার মিয়া মালদার মুঠোফোনে বলেন, তিনি ৩ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। নুরুকে চেনেন। ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী আখাউড়ায় প্রথম হামলা চালায়। এতে নুরু মিয়ার স্ত্রীর মতো এলাকার অনেক লোক হতাহত হন। এরপর পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ চলে।

চিকিৎসক সাঈদ এনাম বলেন, চেম্বারে নিয়ে আসার সময় নূরজাহানের একটু একটু স্মৃতিশক্তি ছিল। অসুস্থতার ইতিহাস জানাতে গিয়ে অগোছালোভাবে মুক্তিযুদ্ধকালে আহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন। মাথায় আঘাত পাওয়ার কথাও বলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এক্স-রে করে মস্তিষ্কে ধাতব পদার্থের অস্তিত্ব মিলেছে। তাঁর মস্তিষ্কের এক–তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। এ কারণে স্মৃতিশক্তি লোপসহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। মস্তিস্কে মর্টার শেলের টুকরা থাকাবস্থায় তাঁর ৫০ বছর বেঁচে থাকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিরল ঘটনা। অস্ত্রোপচার করলে হয়তো এ অবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে। তবে এটা ব্যয়বহুল।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন