default-image

গেল বছরটি করোনার বদান্যতায় বিশ্বজুড়ে শুধু আতঙ্ক আর ভয়েই কেটেছে। এ ভয় মৃত্যুর, এ ভয় প্রিয়জনকে হারানোর। ৮ মার্চ যখন এ দেশেই প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা হলো, মানুষের সে সময়টার আতঙ্কের সঙ্গে শুধু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালের আতঙ্কেরই তুলনা চলে। কিন্তু বছর শেষে বরিশাল বিভাগে করোনায় মৃত্যুকে পেছনে ফেলে দিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান। আর তাতে সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করা লোকজনকে নড়েচড়ে বসতেই হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন ৯ এপ্রিল পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায়। আর বরিশাল জেলায় প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হন ১২ এপ্রিল। এরপর টানা কয়েক মাস লকডাউন তো ছিলই, বছরজুড়েই ছিল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জনসাধারণের সীমিত চলাচল ছিল। এরপরও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল আগের বছরের মতোই। বিষয়টি আমলে নিয়ে সড়কে সচেতনতার কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, বরিশাল বিভাগে সদ্য সমাপ্ত বছরে করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যান ১৯৬ জন। সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় ওই বছরে মারা যান ২৪৩ জন। পাশাপাশি বছরজুড়ে বিভাগে ২৪৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন ৪৫৭ জন। অথচ এর আগের বছর ২০১৯ সাল ছিল অতিমারির নয়, স্বাভাবিক সময়। সে বছর বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল প্রায় সাড়ে ৩০০। আর এতে প্রাণ ঝরেছিল ২৪৪ জনের এবং আহত হয়েছিলেন ৫০০ জনের বেশি। ২০১৯ আর ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যায় হেরফের না হওয়াই প্রমাণ করে সড়কে মৃত্যুফাঁদের ভয়াবহতা।

বিজ্ঞাপন

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের করা ২০২০ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ৬ জানুয়ারি এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করে নিসচা। এতে সড়ক দুর্ঘটনারোধে নানা সুপারিশও করেছে সংগঠনটি।

বরিশালের স্থানীয় উন্নয়ন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান রানের পরিচালক রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এটা একটি ‘অ্যালার্মিং’। কোনোভাবেই এটাকে উপেক্ষা-অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। কেননা, এ জন্য শুধু সড়ক পরিবহন আইনের প্রয়োগই নয়, সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই। করোনা থেকে নিরাপদ থাকার প্রচারণার মতোই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জোরালো প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন।

অদক্ষ চালক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।
সৈয়দ এহসান-উল হক, মহাসচিব, নিসচা

নিসচার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের অভাব, টাস্কফোর্স প্রদত্ত ১১১টি সুপারিশনামা বাস্তবায়ন না হওয়া, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, দৈনিক চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালনা, লাইসেন্স ছাড়া চালক নিয়োগ, পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ওভারটেকিং, বিরতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো বন্ধে আইনের প্রয়োগ না থাকা, সড়ক ও মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার গাড়ি বাড়ানো, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, একই রাস্তায় বৈধ ও অবৈধ এবং দ্রুত ও শ্লথ যানবাহন চলাচল, রাস্তার পাশে হাটবাজার ও দোকানপাট এবং অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮ বাস্তবায়ন না হওয়া এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বরিশাল বিভাগে ২০২০ সালে সবচেয়ে আলোচিত ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে। ওই দিন ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের উজিরপুর উপজেলার আঁটিপাড়া এলাকায় মৃত নবজাতকের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কাভার্ড ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও যাত্রীবাহী বাসের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নবজাতকের বাবাসহ একই পরিবারের পাঁচ সদস্য ও অ্যাম্বুলেন্স চালকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

নিসচার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বরিশাল জেলায়। এ জেলায় ১০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৩ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ২৩৮ জন। এরপরেই আছে পটুয়াখালী জেলা। পটুয়াখালী জেলায় ৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৪৬ জন। এ ছাড়া ঝালকাঠি জেলায় ২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও আহত হন ৬০ জন, পিরোজপুরে ২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও আহত হন ৯ জন, বরগুনায় ১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও আহত হন ৩১ জন এবং ভোলায় ৩৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও ৭৩ জন আহত হন।

সংগঠনের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, সে বছর দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলায় প্রায় সাড়ে ৩০০ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছিল ২৪৪ জনের। ২০১৯ সালে বরিশাল জেলায় সর্বাধিক ১৪১টি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছিল ৯৫ জনের, আহত হন ২০৯ জন। ভোলায় ৬২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫০ জন নিহত ও ৪৬ জন আহত হন। পটুয়াখালীতে ৫০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও আহত হন ৯২ জন। ঝালকাঠিতে ১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছিলেন। পিরোজপুরে ৪১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও আহত হয়েছিলেন ৮৬ জন। আর বরগুনায় ২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ৭১ জন আহত হয়েছিলেন।

বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের জেলাভিত্তিক হিসাব

*নিসচার প্রতিবেদন ২০২০ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান

বিজ্ঞাপন

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় মহাসচিব সৈয়দ এহসান-উল হক কামাল বলেন, সংখ্যাগত দিক থেকে গেল বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা গত দুই বছরের তুলনায় তুলনামূলক কম হয়েছে, এটা ঠিক। তবে এটাকে কম বলা যায় না। কারণ, ২০২০ সালটি করোনা মহামারির বছর ছিল। জরুরি যানবাহন ছাড়া অন্যান্য যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনা আরও কম হওয়ার কথাই ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরের এপ্রিল ও মে—এই দুই মাস ছাড়া অন্য মাসগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা বিগত বছরগুলোর মতোই হয়েছে।

নিসচা মহাসচিব আরও বলেন, অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়ন না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই করোনা প্রতিরোধে সরকারিভাবে যে রকম প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে, একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে প্রচার-প্রচারণা চালানো উচিত।

মন্তব্য করুন