বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জানেরপাড় গ্রামের আরেক খামারি লিটু মিয়া বলেন, ‘খড়, ভুসি, বুটের খোসা, ফিডের দাম মাসে মাসে বাড়োছে। এ্যালা আর গরু পুষি লাভ হওছে না। কায়ও কায়ও গরু পোষার যন্ত্রণা থাকি বাচপার জন্যে গরু বেচে দেওচে।’

তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলায় ছোট–বড় মিলে প্রায় ২৯৫টি গরুর খামার রয়েছে। এ ছাড়া গৃহপালিত প্রায় আড়াই লাখ গরু কৃষকদের ঘরে আছে। এসব গরুকে খড়ের পাশাপাশি গমের ভুসি, ফিড ও বুটের খোসা খাওয়ানো হয়। কিন্তু গত ১০ দিনের ব্যবধানে ফিড, ভুসি ও বুটের খোসায় বস্তাপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা।

তারাগঞ্জের ইকরচালী, হাড়িয়ারকুঠি, আলমপুর, সয়ার ও কুর্শা ইউনিয়নের বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ দিন আগেও গোখাদ্য গমের ভুসি প্রতি বস্তা (৩৭ কেজি) বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা ও বুটের খোসা প্রতি বস্তা (২৫ কেজি) ১ হাজার ২৭০ টাকায়। কিন্তু তা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ভুসি ১ হাজার ৪৫০ টাকা ও বুটের খোসা ১ হাজার ৩২০ টাকা। গাভির ফিড প্রতি বস্তা (২৫ কেজি) বিক্রি হয়েছে ৯৬০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়। এ ছাড়াও চালের খুদ বস্তাপ্রতি বেড়ে ৮০ টাকা। আট থেকে নয় টাকা কেজির ধানের কুঁড়া বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নিজের খামারে গরুর দুধ দোহানোতে ব্যস্ত প্রামাণিকপাড়া গ্রামের রতন সরকার। সাতটি গাভির ছোট একটি খামার আছে তাঁর। দুধ বিক্রির আয়ের টাকায় চলে সংসার। রতন বলেন, ‘আমাদের কষ্ট তো কায় বোঝে না, শোনে না। গাভির খামারের দাম হু হু করি বাড়োছে। কিন্তু দুধের দাম বাড়োছে না। হঠাৎ ফিড, ভুসির দাম বাড়ায় গাভিগুলাক ঠিকমতোন খাবার দিবার পাওছি না। এ জন্যে গরুর স্বাস্থ্য শুকি যাওছে, দুধও কম হওছে। তা–ও হামার পেকে কায়ও দেখছে না।’

default-image

বদরগঞ্জ উপজেলার আমরুলবাড়ি গ্রামের ওবায়দুল হক বলেন, ‘ভুসি, ফিড ছাড়া এই বিদেশি গাভি তো খড়পানি খায় না। একবেলা খাবার না পাইলে চিৎকার শুরু করে। গরুগুলার হাঁকডাক শুনছেল বুকটা ফাটি যায়। বুঝি না হাকাউ এমতোন করি ফিডের দাম বাড়াওছে কেনে। সরকার কেনে এগুলা দেখছে না। ফিড, ভুসির দাম বাড়ায় হামরা গরুক ঠিকমতোন খাবার খিলার পাওছি না।’

তারাগঞ্জের সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আজম বলেন, আগে খোলা মাঠ ছিল, ছিল সবুজ ঘাস। প্রয়োজনের তাগিদে সেই মাঠ এখন আবাদি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। এর কারণে গরু–ছাগলের ঘাসসংকট দেখা দেওয়ায় কৃষক ও খামারিরা কৃত্রিম দানাদার পশুখাদ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছেন কৃত্রিম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাঁরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থাকলেও পশুর খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই।

বদরগঞ্জ উপজেলার রাজরামপুর গ্রামের আরেক খামারি মামুন অর রশিদ বলেন, মানব খাদ্যের দাম নির্ধারণ, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও পশু-পাখির খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে তা নেই। কৃত্রিম খাদ্যের মান নিয়েও নানান প্রশ্ন রয়েছে।

তারাগঞ্জ বাজারের গোখাদ্য ব্যবসায়ী ও ডেইরি খামার মালিক সমিতির সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, চলতি বছরে গোখাদ্যের দাম তিন দফা বেড়েছে। কিন্তু দুধের দাম বাড়েনি। মার্চে প্রতি কেজি ফিডে দেড় টাকা, জুলাই মাসে দুই টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে দেড় টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে হঠাৎ ভুসি, বুটের খোসায় প্রতি বস্তায় ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বড় বড় ব্যবসায়ী গমের দাম বৃদ্ধি ও ফিড তৈরির উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণ জানাচ্ছেন। এতে খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো খামারিদের মধ্যে স্বল্পমূল্যে গোখাদ্য বিক্রয়ে উদ্যোগ নেওয়া সরকারের উচিত।

তারাগঞ্জ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফরহাদ নোমান বলেন, ‘গোখাদ্যের দাম বাড়ার কথা খামারিদের কাছ থেকে শুনেছি। দাম বাড়া-কমা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আমরা খামারিদের বাইরের তৈরি খাবারের পরিবর্তে সবুজ ঘাস গরুকে খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছি। বাড়িতে গরুর সুষম খাদ্য তৈরির পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন