সূত্র জানায়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে ১০ জন করে নানা উপায়ে প্রার্থিতা জানান দিয়েছেন। ১০ জনের মধ্যে দু–একটি ছাড়া বাকি সব কটিতে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। তাঁরা আবার দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। নৌকা পেতে প্রত্যেকের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। এতে করে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা বিপাকে পড়ে যান। বিশেষ করে প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকায় এবং নৌকা পাওয়ার বিষয়ে তাঁদের অবস্থান জোরালো হওয়ায় নেতাদের সমস্যা বাড়ে, বিশেষ করে সাংসদের। তাঁরা বুঝতে পারেন একজনের অধিক কাউকে নৌকা দেওয়া সম্ভব নয়। আর তাই যদি করা হয়, তাহলে হাওরের শান্ত রাজনীতি অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী থেকে যাবেন। চেষ্টা করেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে আনা যাবে না। এতে করে সংঘাত বাড়বে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সরাসরি ক্ষতির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রাষ্ট্রপতির পরিবারে। পরবর্তী সময়ে এর জের গিয়ে পড়বে সাংসদ রেজওয়ানের ঘাড়ে। তখন দলের একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

এক সপ্তাহ ধরে এই জটিলতার মুক্তির পথ খুঁজছিলেন নেতারা। একপর্যায়ে মুক্তির পথ হিসেবে আলোচনায় গুরুত্ব পায় দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন আয়োজনের। পরিকল্পনাটি সাংসদের পছন্দ হয়। পরবর্তী সময়ে আলোচনাটি মাঠপর্যায়ে জোরালো হয় এবং সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন।
সব মিলিয়ে শনিবার গণভবনে স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রস্তাবটি লিখিতভাবে উপস্থাপন করেন সাংসদ রেজওয়ান। বোর্ড সাংসদের আবেদনের পক্ষে অবস্থান নেয়।

এই বিষয়ে সাংসদ রেজওয়ান আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতীক হিসেবে নৌকা অপছন্দ—হাওরে এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। দলের প্রতি প্রত্যেকের ভালোবাসা ও ত্যাগ কম নয়। সমস্যা হলো সবাই নৌকা চান। এই অবস্থায় একজনকে নৌকা দিয়ে পরিবেশটি সংকুচিত করতে চাইনি। সে কারণেই নৌকা ছাড়া নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাওরের নির্বাচনে প্রতীক হিসেবে দলীয় কেউ নৌকা পাচ্ছেন না—এ তথ্য জানার পর এলাকার বেশির ভাগ মানুষ এটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। ছোট একটি অংশ ছাড়া বেশির ভাগ প্রার্থী খুশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অষ্টগ্রামের কলমা ইউপির এক দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বলেন, অনেকে মাঠে এগিয়ে, বিপরীতে দলীয় প্রতীক পাওয়ার দৌড়ে ততটাই পিছিয়ে। কাউকে প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় মাঠের প্রার্থীদের উপকার হয়ে গেল।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য, তফসিল ঘোষণার আগ থেকেই দুই উপজেলার অন্তত অর্ধশত মনোনয়নপ্রত্যাশী তৃণমূলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না রেখে নেতাদের বাড়িঘরমুখী হয়ে পড়েন। আর ঢাকায় যাতায়াত বেড়ে গিয়েছিল। ওই সব মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিশ্বাস ছিল, নৌকা পেলেই জয় নিশ্চিত। সে কারণে প্রতীক নিশ্চিত করার বিষয়ে কমবেশি সবাই অধিক মনোযোগী হয়ে পড়ে।

নৌকা প্রতীক বরাদ্দ না দেওয়ার কারণ জানতে কথা হয় অষ্টগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।

শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমত হাওরের সবাই নৌকার সমর্থক। পরের কথা হলো এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেই। ফলে সব প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় আওয়ামী লীগ। এই অবস্থায় নৌকা প্রতীক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংকুচিত করাটা ঠিক হবে না—এই ভাবনা থেকে নৌকা না বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আমরা একমত হই।’

এদিকে দলীয় একটি পক্ষ জানায়, প্রতীক না থাকায় নির্বাচনটি অধিক অংশগ্রহণমূলক ও উত্তেজনাপূর্ণ হবে। দলীয় নেতারা বাধাহীনভাবে যেকোনো প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন। তখন প্রতীক পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হলেও এখন শুরু হবে নেতাদের নিজেদের করে নেওয়ার যুদ্ধ। মর্যাদা বাড়বে ভোটারদের। কারণ, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনকালীন মর্যাদা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল।

মিঠামইন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বৈষ্ণব বলেন, নির্বাচন ঘিরে দলীয় কোন্দল স্পষ্ট হয়। কোন্দল নতুন করে মাত্রা পায়। প্রতীক না থাকায় অন্তত এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা যাবে।