সুনামগঞ্জে এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিরাই উপজেলায়। এই উপজেলার চাপতির হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসলহানি ঘটে ৭ এপ্রিল। ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির এই হাওরের ধান তখন কাঁচা। হাওরডুবিতে তিনটি ইউনিয়নের ৪৬টি গ্রামের মানুষের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

চাপতির হাওরপাড়ের তাজপুর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন (৫০) এখন নিজের ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু হাওরের ফসল হারিয়ে এখন দিশাহারা তিনি। বছরের খোরাকি জোগাড়ের চেষ্টায় ছেলেদের নিয়ে অন্য এলাকা গিয়ে ধান কাটার শ্রমিকেরা কাজ করছেন। কৃষক আবুল হোসেন নিজে ১২ একর জমি আবাদ করেছিলেন। জমি চাষবাস করার সুবিধার্থে কার্তিক মাসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসে হাওরপাড়েই গড়েছিলেন অস্থায়ী আবাস। প্রায় ৬০০ মণ ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা, কিন্তু ফিরেছেন শূন্য হাতে।

আবুল হোসেন বলেন, এসব জমির আবাদ করতে গিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ধারদেনা করে আনা এই টাকা ফসল তোলার পর শোধ করার কথা। তিনি বলেন, ‘আমি এখন পথের ফকির। কিলা খাইতাম, কিলা চলতাম, এই চিন্তায় পাগল।’
আবুল হোসেনের স্ত্রী সোনারা বেগম (৪২) জানান, ঘরে কোনো চাল নেই। এখন বাপ-ছেলেরা মিলে রুজি করে আনলে চুলা জ্বলে, না হলে উপোস। ঈদে কী করবেন, জানতে চাইলে সোনারা বলেন, ‘মনে ত কত আশাই আছিল। আনন্দ করমু, কাপড় কিনমু, পিঠা-সন্দেশ বানাইমু। ধান পাইলে আশা পূরণ অইত, ধান নাই, আনন্দও নাই।’

তাজপুর গ্রামের বড় গৃহস্থ তাহিম উদ্দিন (৬০) বলেন, হাওরের ধানের ওপরই একটি কৃষক পরিবারের পুরো বছরের সংসারের খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া, বিয়েশাদি সবকিছু নির্ভর করে। কোনো কারণে এই ধান না পেলে কৃষক পরিবারের কষ্টের সীমা থাকে না। এবার চাপতির হাওরে সেটিই হয়েছে। এই হাওরপাড়ের কৃষকের মধ্যে ঈদের কোনো আনন্দ নেই; বরং ঘরে ঘরে কষ্ট আছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাঁদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। শুধু মুখে মুখে বড় বড় কথা বললে হবে না, কৃষকের পরিবারের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াসহ সবধরনের সহযোগিতা দিতে হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১৯টি হাওরে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাঁদের ১০ লাখ টাকা, চাল ও শুকনা খাবার সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও সহযোগিতা দেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন