পারিবারিক টানাপোড়েনের মধ্যেও হাদিসুর নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা করে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন। নিয়েছিলেন পরিবারের দায়িত্ব। আমেনা খাতুনের আশা ছিল, এবার দেশে ফেরার পর ধুমধামে বিয়ে করাবেন ছেলেকে। জরাজীর্ণ ঘর ভেঙে নতুন ঘর তুলবেন। কিন্তু নিমেষে সব তছনছ হয়ে গেছে।

বরগুনার বেতাগী উপজেলার প্রত্যন্ত হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে হাদিসুরদের বাড়িতে এখনো শোকের নিস্তব্ধতা। গত বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, সুনসান বাড়ির বারান্দায় হাদিসুরের বাবা আবদুর রাজ্জাক বিছানায় শুয়ে মুঠোফোনে একের পর এক ছেলের ছবি দেখছেন আর নীরবে চোখের জল ফেলছেন। ছেলের কথা তুলতেই একপর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার আরিফ (হাদিসুরের ডাকনাম) কি ফিরাইয়্যা আইয়্যা বাবা কইয়্যা আর ডাক দেবে না? বাড়ি আইলে কত্ত বড় গলায় দরজা দিয়া ডাক দিত, আব্বা আমি আইছি...।’

হাদিসুরের স্মৃতি রয়েছে পুরো বাড়িতে। ঘর থেকে বারান্দায় কান্নার শব্দ শুনে হাদিসুরের মা আমেনা খাতুন ছুটে আসেন। কান্না সামলাতে পারছিলেন না তিনিও। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেন, ‘দুর্ঘটনার ছয়-সাত দিন আগে ওর বাবা গরুর মাংস খেতে চেয়েছিল।

আমার কাছ থেকে হাদিসুর তা শুনে ওর মেজ ভাইকে বাজারে পাঠায়। বাজারে গিয়ে মেজ ছেলে হাদিসুরকে ফোন করে বলে, ভাইয়া গরুর মাংস কেনা যাইবে না, ৭০০ টাকা কেজি। হাদিসুর ও প্রান্ত থেকে ফোনে বলছিল, তাতে কী, ৭ হাজার তো আর না। এমন ছেলে না থাকলে কি ঈদ থাকে? হাদিসুরই তো ছিল আমাদের কাছে ঈদের মতন। আল্লাহ ওকে নিয়ে গেছে, আমাদের জীবন দিয়ে ঈদও চলে গেছে।’

হাদিসুরের মৃত্যুর পর পুরো পরিবার ছন্দহীন। আকস্মিক ঝড়ে যেন সবকিছু থমকে গেছে। বাবা আবদুর রাজ্জাক ছেলের শোকে এখন সারা দিন বারান্দায় একা একা নীরবে কাটান। আবার কখনো ছেলের কবরের পাশে গামছা বিছিয়ে শুয়ে থাকেন।

আমেনা খাতুনের জীবনও পাল্টে গেছে। রোগে-শোকে ভঙ্গুর শরীর। কিছু খেতে পারেন না। জোর করে খেতে গেলে ছেলের চেহারা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ‘মা, তুমি বড় বড় লোকমা দাও, আমি দেখি তুমি সুস্থ আছ’ মৃত্যুর আগের দিন ভিডিও কল করে মায়ের কাছে এমন আবদার করেছিলেন হাদিসুর। খেতে বসলে কানে ভাসে ছেলের এই আকুতি। তখন তিনি চোখের জলে ভাসেন।

হাদিসুর মেধাবী ছিলেন। ২০০৮ সালে বেতাগী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন বেতাগী সরকারি কলেজে। আর্থিক টানাপোড়েনে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় ২০১০ সালে জিপিএ–৪.৯৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমিতে। ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুরের একটি জাহাজে নৌ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হাদিসুর। ২০১৮ সালে এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে যোগ দেন তিনি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর অলভিয়া বন্দরে আটকে পড়ে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি বাংলার সমৃদ্ধি। সেখানে নোঙর করা অবস্থায় ২ মার্চ বাংলাদেশি ওই জাহাজে রকেট হামলায় নিহত হন হাদিসুর রহমান। এরপর বন্দরের আশপাশ এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশের নাগরিকদের সহায়তায় ৩ মার্চ জাহাজে থাকা ২৮ নাবিককে উদ্ধার করে তাঁদের বাংকারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ৯ মার্চ ২৮ নাবিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। জাহাজটির ২৯ জন নাবিক ও প্রকৌশলীর মধ্যে ২৮ জন দেশে ফিরলেও হাদিসুরকে ফিরতে হয়েছে লাশ হয়ে।

হাদিসুরের মেজ ভাই তরিকুল ইসলাম পটুয়াখালী সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। ছোট ভাই গোলাম মাওলা ঢাকার কবি নজরুল কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সবার বড় বোন সানজিদা আক্তার পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত, তাঁর বিয়ে হয়েছে।

বাড়িতে এখন শুধু হাদিসুরের মা-বাবা থাকেন। আমেনা বেগম বলেন, ‘এখন পরিবার চলতে খুব কষ্ট। দুই ছেলে পড়াশোনা করে টিউশনি করে। ওরা চলবে না কি আমাদের চালাবে?’

হাদিসুরের মৃত্যুর পর স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা পেয়েছিলেন। আর ঈদ উপলক্ষে কোনো সহায়তা পাননি। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে, এ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তাড়া করছে তাঁদের।

আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আমেনা খাতুন বলেন, ‘মেজ ছেলের একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে পরিবারটা টেনেটুনে নিতে পারত। কিন্তু কে দেবে চাকরি?’