‘হামরা না খায়া থাকমো, তবু তোমাক আর কোনোটে যাবার দিবার নই’

বিজ্ঞাপন
default-image

ভারতীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ২৫ বাংলাদেশি চিলমারী পৌঁছালে অপেক্ষমাণ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। তাঁদের বহনকারী বাসটি বুধবার মধ্যরাতের কিছু আগে চিলমারী উপজেলার রমনা ব্যাপারীপাড়া পৌঁছাতেই এক আনন্দাশ্রুভরা দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধ প্রিয়জনকে সবার আগে দেখবেন বলে সড়কে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।

আজ বৃহস্পতিবার এই ২৫ বাংলাদেশি ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এবং তাঁদের সহায়তা দিতে ছুটে আসেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান শওকত আলী সরকার বীর বিক্রম, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুর ই জান্নাত রুমি, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুস সরকার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আছমা বেগম, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম প্রমুখ। দুপুরে উপজেলা পরিষদের হলরুমে পরিবারগুলোকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়।

খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল ১০ কেজি চাল, সাবান, তেল, ডাল, গামছা, লুঙ্গি, শাড়ি, স্যান্ডেল, মগ, হাঁড়ি, জগসহ বাচ্চাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। এ সময় মন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ‘সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আপনাদের মুক্ত করে আনতে পেরেছি। আমরা সব সময় আপনাদের পাশে আছি। আপনাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

এর আগে লালমনিরহাট বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে ২৫ যাত্রীকে নিয়ে ছেড়ে আসা বাসটি চিলমারীর রমনা ব্যাপারীপাড়ায় বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পৌঁছায়। এ সময় অন্ধকার ভেদ করে স্বজনদের কান্নার রোল ভেসে আসতে থাকে। গাড়ির হেডলাইটের আলো অপেক্ষমাণ পরিবারের সদস্যদের মুখে পড়লে বুকফাটা আর্তনাদের দৃশ্য চোখে পড়ে। স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের এ কান্নার শব্দ অন্ধকারের ভেতর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গাড়ি তাঁদের সামনে দাঁড়াতেই মুহূর্তে ঘিরে ধরেন পরিবারের সদস্যরা। স্ত্রী তাঁর স্বামীকে, সন্তান বাবাকে, বাবা সন্তানকে একবার ছুঁয়ে দেখতে বাসের গ্লাসে হাত দেন। আর চোখ দিয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়তে থাকে পানি। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

একসময় একে একে সবাই বাস থেকে নেমে আসেন। প্রথমে নামেন তাঁদের আনতে যাওয়া রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের কমিটির সাবেক সভাপতি নাহিদ হাসান। এরপর নামেন গণকমিটির সদস্য জামিরুল ইসলাম ও মাইদুল ইসলাম। এরপর ২৫ জনের মধ্যে প্রথমে রেজাউল করিম নেমে এলে তাঁর মা রেজিনা বেগম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বারবার বলতে থাকেন, ‘মোর সোনা ফিরি আসছে গো। মুই আর কিছুই চাং না।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
জেলবন্দী ওই ২৫ বাংলাদেশিকে গত শনিবার আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় মুক্তির আদেশ দেন ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলার বিলাসীপাড়া মহকুমা জুডিশিয়াল আদালত। তাঁরা মুক্তি পেয়ে চিলমারীতে আসেন বুধবার মধ্যরাতের কিছু সময় আগে।

এই ২৫ জনের আরেকজন সাইফুল ইসলাম গাড়ি থেকে মাটিতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী রাবেয়া, চার মেয়ে ও এক ছেলে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করতে থাকে। একসময় তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম বলেন, ‘তোমাক আর কোনোটে যাবার দিবার নোয়াং। হামরা না খায়া থাকমো। তবু বাড়ি থাকি তোমাক কোনোটে যাবার দিবার নই।’

আমিনুল ইসলামের মা মারায়া খাতুন বলেন, ‘ভাববার পাই নাই ছাওয়া ফিরি আসপে।’

এ সময় নাহিদ হাসান সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ভারতে বন্দী ২৫ বাংলাদেশি কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে বুধবার বিকেল ৪টায় বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির নেতা-কর্মীরা। বুধবার রাতে তাঁদের নিয়ে বাসটি কুড়িগ্রাম আসার পর শহীদ মিনারে এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে শুভেচ্ছা জানান বাংলাদেশ বর্ডার ভিকটিম রেসকিউ ফোরামের কনভেনর আব্রাহাম লিংকন, গণকমিটির নেতা বশির আহাম্মেদ, আবদুল কাদেরসহ অনেকে। এ সময় আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ সরকার ও কূটনীতিকদের প্রচেষ্টা, মানবাধিকার সংস্থার সহযোগিতা এবং গণকমিটির আন্দোলনের ফলে আপনাদের মুক্তি সহজ হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

উল্লেখ্য যে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সময় চিলমারীর ২৬ নাগরিক ভারতে বেড়াতে যান। সেখানে তাঁরা আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে কেউ মাছ ধরা, কেউ বিভিন্ন খামারে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন।

এরই মধ্যে করোনায় ভারতে দ্বিতীয় ধাপের লকডাউন দিলে গত ২ মে দুটি মিনিবাসে করে আসাম রাজ্যের জোরহাট জেলা থেকে পশ্চিমবঙ্গের চেংরাবান্ধা চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে ফেরার উদ্যোগ নেন এই ব্যক্তিরা। ফেরার পথে ৩ মে সকালে বাহালপুর এলাকায় ধুবড়ি জেলা পুলিশ তাঁদের আটক করে। পরে ৫ মে তাঁদের বিরুদ্ধে ভিসার শর্ত ভঙ্গের মামলা হয়।

এর মধ্যে গত ১ জুলাই পুলিশি হেফাজতে বকুল মিয়া নামের একজন মারা যান। চার দিন পর মরদেহ ফেরত পায় তাঁর পরিবার।

ভারতের জেলে বন্দী ওই ২৫ বাংলাদেশিকে গত ২৯ আগস্ট মুক্তির আদেশ দেন দেশটির আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলার বিলাসীপাড়া মহকুমা জুডিশিয়াল আদালত। ধুবড়ি জেলার বিলাসীপাড়া মহকুমা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জতিরুপা হালৈর আদালত ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় ২৫ বাংলাদেশিকে মুক্তি দেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন