বিজ্ঞাপন
default-image

ডিম ছাড়তে মা মাছ বজ্রপাত আর বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের যেকোনো পূর্ণিমা ও অমাবস্যার কয়েক দিন আগে ও পরে মা মাছ ডিম হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে। তবে গত মঙ্গলবার রাতে এবং গতকাল বুধবার দুপুরে বজ্রপাত ও বৃষ্টি ছাড়াই নদীতে দুই দফায় নমুনা ডিম ছেড়েছিল মা মাছ। প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে পূর্ণমাত্রায় ডিম দেওয়ার আগে মা মাছ অল্প পরিমাণে ডিম ছাড়ে। একে নমুনা ডিম বলে। বুধবার দিবাগত রাত ১টার পর থেকে জোয়ারের সময় নদী–তীরবর্তী দুই উপজেলা রাউজান ও হাটহাজারী অংশে অন্তত ১২ থেকে ১৫ স্থানে পুরোদমে ডিম ছাড়ে মা মাছ। প্রতিটি নৌকায় আধা বালতি থেকে এক বালতি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন আহরণকারীরা। আবার কেউ কেউ তারও কম পেরেছেন বলে জানিয়েছেন।

বুধবার বিকেলে স্পিডবোটে করে ডিম সংগ্রহ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন রাউজানের সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমানসহ জেলা মৎস্য অধিদপ্তর, নদী গবেষক ও দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

মৎস্য অধিদপ্তর ও নদী গবেষকেরা বলছেন, নদীর দূষণ রোধ হয়ে গত ২০ বছরে সবচেয়ে ভালো পরিবেশ ছিল এবার। এ কারণে নদীতে প্রচুর মা মাছের বিচরণ ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে নদীর পানির লবণাক্ততা প্রায় ৭২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া, প্রজনন মৌসুমেও বজ্রসহ বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে ডিমের পরিমাণ কমে গেছে।

default-image

হাটহাজারীর মদুনাঘাট হ্যাচারিতে ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের কাজে তদারকিতে থাকা সাতকানিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত শর্মা বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ওই হ্যাচারিতে ৫০ থেকে ৬০ বালতি ডিম রেণু ফোটানোর জন্য এনেছেন আহরণকারীরা। মাদার্শা মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে দায়িত্বে থাকা চন্দনাইশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এখানে ১০৬টি নৌকার ২০০ জন আহরণকারী ১১০ বালতি ডিম রেণু উৎপাদনের জন্য এনেছেন।

হালদা পাড়ে থাকা চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ৩০০ নৌকার প্রতিটি ১ কেজি করে নমুনা ডিম আহরণ করেছে। দুই দফায় মোট আহরণের পরিমাণ সাড়ে ৩০০ কেজি হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। তবে তৃতীয় দফায় পুরোদমে ডিম ছাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আশানুরূপ পরিমাণ দেখছি না। এটা হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। তবে আমরা আশাবাদী, আবারও ডিম ছাড়বে মা মাছ। সে সময় বজ্রসহ বৃষ্টি হলে পরিমাণ বাড়তে পারে।’

গত বছর রেকর্ড ভঙ্গের পর এবারও ছিল আশা

নদীর মদুনাঘাট থেকে সর্তারঘাট পর্যন্ত  প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, অন্তত দুই তীরের ১২ থেকে ১৫টি  স্থানে শত শত নৌকা নিয়ে ডিম আহরণকারীরা ডিম আহরণ করছেন। রাউজানের পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের আজিমেরঘাট, পশ্চিম কাগতিয়া, নাপিতের ঘাট, হাটহাজারীর রামদাশ মুন্সিরহাট, আমতুয়া, গড়দোয়ারা ইউনিয়নের নয়াহাট, মাছুয়াঘোনাসহ আরও একাধিক স্থানে ডিম পাওয়া গেছে। এসব এলাকা ঘুরে আহরণকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপেক্ষায় থাকা পাঁচ শতাধিক ডিম আহরণকারী প্রত্যেকে ২ কেজি থেকে শুরু করে কেউ কেউ এক বালতি পর্যন্ত নমুনা ডিম পেয়েছেন।

এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যায় আধা ঘণ্টা বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হলেও মঙ্গলবার কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। তবে বুধবার সকালে সামান্য বৃষ্টি হয় নদী এলাকায়। এর মধ্যে প্রথম দফায় দুই দিন নমুনা এবং তৃতীয় দফায় বৃহস্পতিবার পুরোদমে ডিম ছাড়ে মা মাছ। এ মাসের শুরু থেকে পূর্ণ প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ায় নদীতে অপেক্ষায় ছিলেন ডিম আহরণকারী ও সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা আশা করেছিলেন, বজ্রপাতসহ ভারী বৃষ্টি হলে মা মাছ প্রচুর ডিম ছাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা হতাশ।

আজ সকাল থেকে দুপুরে দেখা গেছে, দুই উপজেলার ৪টি সরকারি হ্যাচারি ও ১৪৫টি মাটির কুয়ায় ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের কাজ করছেন আহরণকারীরা। প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা তাঁদের সহযোগিতা করছেন। ডিমের মোট পরিমাণ নির্ধারণ করতে দু-এক দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।

default-image

হালদা নদীর প্রধান দুই দূষণের উৎস ছিল হাটহাজারীর ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট ও এশিয়ান পেপার মিল। দুই বছর হলো উপজেলা প্রশাসন দুটিই বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া লকডাউনের কারণে বায়েজিদ অঞ্চলের বেশ কিছু কারখানা বন্ধ থাকায় তার ইতিবাচক প্রভাব হালদায় পড়েছে। হালদায় গত বছর ডিম আহরণে গত ১৪ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছিল। সেবার ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম পাওয়া গিয়েছিল। এর আগের বছর ডিম আহরণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার কেজি।

হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এবার আশানুরূপ ফল পাইনি। এর কারণ ইয়াসের কারণে নদীতে লবণাক্ততা ৭২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন বজ্রসহ বৃষ্টি না হওয়া।’ তিনি বলেন, ‘এবার পরিবেশ মাছের অনুকূলে ছিল না। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত ছাড়াই মা মাছ ডিম ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, গত ২০ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ছিল নদীর পরিবেশ। এ কারণে প্রচুর মা মাছ বিচরণ করছিল। তবে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে হতাশা নেমে এল। তারপরও আবারও মা মাছ ডিম দেবে বলে আমরা আশাবাদী।’

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ রুহুল আমিন এবং রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোনায়েদ কবির বলেন, নদীতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন তাঁরা। তা ছাড়া নদীর অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে প্রজনন এলাকার ১০ কিলোমিটার এলাকা এখন সিসি ক্যামেরার আওতায় এনেছে নৌপুলিশ। পাশাপাশি প্রশাসনের নজরদারিতে সব ধরনের বালু উত্তোলন এবং ড্রেজার ও যান্ত্রিক নৌযান চলাচল বন্ধ আছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন