বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে ৯ জন এবং নারী ওয়ার্ডে ১২ জন চিকিৎসাধীন। তাঁদের সবাই হাসপাতালে আসতে গিয়ে দুর্ভোগের কথা জানালেন। দোয়ারিকা গ্রামের মোকছেদ আলী (৭০) পেটব্যথা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে আওনের রাস্তা নাই। গাঙ্গে নামাইয়্যা নেছে। শ্যাষে তিন-চার মাইল ঘুইর‌্যা ভ্যানে হাসপাতালে আইছি। যে রাস্তায় দিয়া আইছি, হেইয়্যাও ভালো না। ভাঙাচুরা ইটের। ঝাঁকনিতে দম বন্ধ অওনের অবস্থা।’

একই কথা বলেন, নারী ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা আছমাউল হোসনা (৪৭)। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে আসতে যে দুর্ভোগ, তাতে একবার এলে দ্বিতীয়বার আর কেউ আসতে চাইবে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আগে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ২০০ জনের মতো রোগী আসতেন। গত ২৭ আগস্ট সড়কটি বিলীন হওয়ার পর দিনে ৫০ জনও আসেন না। আবার নিয়মিত ইপিআই টিকা ও করোনার টিকা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ কোনো রোগীকে গত প্রায় এক মাসে অ্যাম্বুলেন্সে অন্য কোথাও পাঠানো যায়নি।

স্থানীয় বাহেরচর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা, মাধবপাশা ও রহমতপুর ইউনিয়ন থেকে বরিশাল শহরে যোগাযোগের ব্যবস্থা ভালো। তবে বাকি তিন ইউনিয়ন—আগরপুর, কেদারপুর ও দেহেরগাতি থেকে জেলা শহরের দূরত্ব অনেক বেশি। তেমনি যোগাযোগব্যবস্থাও ভালো নয়। ফলে এই তিন ইউনিয়নের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালটিতে যাতায়াতের সড়কটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় এসব মানুষের দুর্ভোগের সীমা নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার সড়কটি নেমেছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের রাকুদিয়া নতুন হাট থেকে। কেদারপুর পর্যন্ত এই সড়কের দৈর্ঘ্য আট কিলোমিটার। গত ২৭ আগস্ট বিকেলে এই সড়কের মাঝবরাবর বাহেরচর ক্ষুদ্রকাঠি এলাকায় ৫৪৫ মিটার নদীতে বিলীন হয়।

বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুভাস সরকার বলেন, সড়ক বিলীন হওয়ায় হাসপাতালের কর্মীসহ অনাবাসিক চিকিৎসকেরা যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া করোনার টিকা নিতে ইচ্ছুক অনেকেই হাসপাতালে আসতে পারেননি। হাসপাতালে আসার বিকল্প একটি রাস্তা আছে। কিন্তু সেটি খুব সরু। পাশাপাশি দুটি যান চলাচল করতে পারে না। আবার ইট বিছানো ওই সড়ক দিয়ে যেতে হলে বাড়তি তিন কিলোমিটার পথ ঘুরতে হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বিলীন হয়ে যাওয়া সড়কের ওই অংশে ভাঙনরোধে কাজ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে পাউবো ওই এলাকায় বালুভর্তি ব্যাগ (জিও) ফেলছে। এই কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বলছেন, বালুর ব্যাগ ফেলে এই স্থানে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না। এখানে স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরোধব্যবস্থা না নিলে ভাঙন চলতেই থাকবে। এখন যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা ‘পানিতে টাকা ফেলা’ ছাড়া কিছুই নয়। আদতে ভাঙনরোধে কোনো কাজে আসবে না। বরং সরকারি এই অর্থের অপচয় হবে এবং কিছু লোকের পকেট ভারী হবে।

দেহেরগতি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি স্থানীয় আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম সড়কটি। সেখানে সুগন্ধা নদীর অপর প্রান্তে জেগে ওঠা চর খনন করা দরকার। এর মাধ্যমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ভাঙন রোধ করা সম্ভব।

এলাকাবাসী বলছেন, প্রতিদিনই সুগন্ধার বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীতীরের বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ বহু স্থাপনা। ইতিমধ্যে দেহেরগতি ইউনিয়নের চরসাধুকাঠি, বাহেরচর ঘোষকাঠি, উত্তর রাকুদিয়াসহ নদীসংলগ্ন গ্রামের বহু ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সুগন্ধা নদীর পাশাপাশি সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরও অব্যাহতভাবে ভাঙছে। একে একে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন।

জানতে চাইলে পাউবোর বরিশাল জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস প্রথম আলোকে বলেন, জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতাল সড়কটির সুরক্ষায় বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। আর সন্ধ্যা, আড়িয়াল খাঁ ও সুগন্ধা নদীর ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষার জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছেন তাঁরা। অচিরেই এই প্রস্তাব যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। সেটি অনুমোদন হয়ে এলেই দ্রুততার সঙ্গে ভাঙনরোধের টেকসই কাজ শুরু হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন