বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঠাকুরগাঁও আলু চাষের জন্য বিখ্যাত। এখান থেকে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা আলু কিনে দেশের অন্য জেলায় নিয়ে যান। আলুর সঙ্গে তিনটি পক্ষ সম্পৃক্ত—আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ। গত ১০ বছরে ছয় বছরই আলুতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসান করেছেন। এর মধ্যে তিনটি বছর সব পক্ষই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। আর চলতি মৌসুমে লোকসানের সেই মাত্রা ছাড়িয়ে আরও বড় ক্ষতি দেখছেন তাঁরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় সূত্রমতে, ২০২০ সালে জেলায় ২৫ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। আলু উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ৭২০ মেট্রিক টন। সেবার বাজারে আলুর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লাভ করেন। এতেই কৃষক আলু চাষে ঝুঁকে পড়েন। এ বছর কৃষক ২৮ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেন। ফলন পান ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন।

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে হিমাগারের ফটকে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছেন মালিকেরা। ওই নোটিশে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী হিমাগারে আলু সংরক্ষণের শেষ তারিখ ১৫ নভেম্বর। ওই দিনই হিমাগারের সব কুলিং মেশিন বন্ধ করে দেওয়া হবে।

আলুচাষি ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ে আলু সংরক্ষণের জন্য সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে ১৫টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারের ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করার যায়, যা এ মৌসুমে আলু ফলনের ২০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। হিমাগারে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও আলুর ব্যাপক ফলন দেখে হিমাগারের মালিকেরা ৩২০ টাকা দাবি করেন। এতে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায়। অতিরিক্ত ভাড়া দাবির প্রতিবাদে তাঁরা গত চলতি বছরের ১৯ মার্চ শহরে মানববন্ধন করেন। পরে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে ২৫০ টাকা বেঁধে দেওয়া হয়।

এদিকে অধিকাংশ আলুই হিমাগারে সংরক্ষণের বাইরে থেকে যাওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় আলুর দাম পড়তে থাকে। এ অবস্থায় গত জুলাই মাস পর্যন্ত কৃষক-ব্যসায়ীদের হিমাগারে রেখে দেওয়া আলু একেবারেই বের করার সুযোগ হয়নি। বাজারে ব্যাপক সরবরাহ থাকায় আলুর দামও আর বাড়েনি। দাম বাড়ার আশায় থাকা কৃষক-ব্যবসায়ীরা সামান্যই আলু বের করার কারণে হিমাগারে ব্যাপক পরিমাণ আলুর মজুত থেকে গেছে।

এ অবস্থায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে হিমাগারের ফটকে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছেন মালিকেরা। ওই নোটিশে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী হিমাগারে আলু সংরক্ষণের শেষ তারিখ ১৫ নভেম্বর। ওই দিনই হিমাগারের সব কুলিং মেশিন বন্ধ করে দেওয়া হবে। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে হিমাগার থেকে আলু বের করে নেওয়ার জন্য চাষি ও ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হলো। এ অবস্থায় আলু নষ্ট হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

আন্দোলন করে ভাড়া কমিয়ে আনার কারণে, হিমাগারের লোকজন ঠিকমতো পাওয়ার লোড দেননি, গ্যাস মারেননি। এতে এখনই আলুতে গাছ গজায় গিয়েছে।
আলু চাষি সোহরাব হোসেন

বালিয়া গ্রামের কৃষক রহমত আলী (৫৬) বলেন, হিমাগারে হাজারখানেক আলুর বস্তা রেখেছিলেন। উৎপাদন খরচ, বস্তা কেনা, পরিবহন ও হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া মিলিয়ে প্রতি বস্তা আলুর ন্যূনতম খরচ পড়ে ৯০০ টাকার ওপরে। এখন পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা আলু ৭২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রতি বস্তা আলুতে ১৮০ টাকা লোকসান হচ্ছে। আর হিমাগার থেকে সব আলু বের করতে হলে আলুর দাম কত টাকায় নামবে, তা ভাবতে পারছেন না তিনি।

জগন্নাথপুর এলাকার আলু চাষি সোহরাব হোসেন (৪১) বলেন, ‘আন্দোলন করে ভাড়া কমিয়ে আনার কারণে, হিমাগারের লোকজন ঠিকমতো পাওয়ার লোড দেননি, গ্যাস মারেননি। এতে এখনই আলুতে গাছ গজায় গিয়েছে। এখন মেশিন বন্ধ করে দিলে সেসব আলু পচে নষ্ট হয়ে যাবে।’

default-image

আলুচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘আমরা হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া নিয়ে যে আন্দোলন করেছিলাম, সেটাই আমাদের কাল হয়েছে। এখন মালিকেরা সেই আক্রোশ থেকেই ১৫ নভেম্বরে হিমাগারের কুলিং মেশিন বন্ধ করে দিতে জেদ ধরে বসে আছেন।’ তিনি বলেন, এমনটি হলে হিমাগারে সংরক্ষণ করা বীজআলু নষ্ট হয়ে যাবে। এতে আগামী মৌসুমে বীজআলুর সংকটে আবাদ কম হবে। এতে হিমাগারের মালিকদেরই যে ক্ষতি, জেদের কারণে তা তাঁরা বুঝতে চাচ্ছেন না।

আলুচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা নুরুল হুদা স্বপন দীর্ঘদিন ধরে আলুর উৎপাদন ও বাজারদর নিয়ে বিশ্লেষণ করে আসছেন। তাঁর তথ্যমতে, গত ১০ বছরের মধ্যে ২০১২, ২০১৬, ২০১৯ ও ২০২০ সালে কৃষক আলুতে লাভ করেছেন। ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে লোকসান করেন। আর ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৭ সালে আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ—সবাই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ বছরও লোকসানের সেসব বছরকে ছাড়িয়ে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হিমাগারে সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষকের ঘরেও রেকর্ড পরিমাণ আলু ছিল। চাহিদার তুলনায় সংরক্ষণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় হিমাগার থেকে ৫০ ভাগ আলুও বের হয়নি।
আবু হোসেন, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঠাকুরগাঁও

হাওলাদার হিমাগারের গুদামরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, এ বছর তাঁদের হিমাগারে ১ লাখ ৮০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অন্যবার এ সময়ের মধ্যে ১ লাখ ৫০ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু হিমাগার থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু এ বছর বের হয়েছে প্রায় এক লাখ বস্তা। বিশাল এই আলুর মজুত নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। শেষ পর্যন্ত কৃষক-ব্যবসায়ীরা হিমাগারে রাখা আলু বের করবেন কি না, তা নিয়ে আশঙ্কায় দিন কাটছে তাঁর।

ঠাকুরগাঁওয়ে শাহী হিমাগারের চারটি ইউনিট রয়েছে। এ বছর সেসব হিমাগারে ৩২ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। শাহী হিমাগারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, অন্য সব বছরের তুলনায় এবার বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে পড়ে আছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হিমাগার থেকে ৪৬ ভাগ আলু বের হয়েছে। সংরক্ষণ করা ওই সব আলু আর বের হবে কি না, এ নিয়ে তাঁরাও বিপাকে আছেন। মার্চ থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত আলু সংরক্ষণের সময়। আলু সংরক্ষণের চুক্তিতেই শর্তটি উল্লেখ করা আছে। এই সময়ের মধ্যে কৃষক-ব্যবসায়ীরা আলু তুলতে না এলে হিমাগারের মালিকেরা লোকসানে পড়বেন। আবার চুক্তির অতিরিক্ত সময় হিমাগারের মেশিন চালু রাখতে গেলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের এই দিকও ভেবে দেখতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, হিমাগারে সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষকের ঘরেও রেকর্ড পরিমাণ আলু ছিল। চাহিদার তুলনায় সংরক্ষণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় হিমাগার থেকে ৫০ ভাগ আলুও বের হয়নি। মেশিন বন্ধ করলে কৃষক-ব্যবসায়ীদের একবারে হিমাগার থেকে আলু বের করে আনতে হবে। এতে আলুর বাজারমূল্যে প্রভাব পড়বে। আর সংরক্ষণ করা বীজআলুও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে আলুর সঙ্গে সম্পৃক্ত চাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিষয়টি নিয়ে তিন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের একটা পথ বের করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হলাম। সমস্যাটি সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন