তুচ্ছ ঘটনায় গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানার ঈদগাহ কাঁচা রাস্তার মোড়ে দুই দল কিশোরের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার একপর্যায়ে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় শাহরিয়ার নাজিম ওরফে ফাহিম (১৫)। এই ঘটনায় তার বাবা মো. জহির বাদী হয়ে পাহাড়তলী থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। তিনি পেশায় মোটরসাইকেলের মিস্ত্রি।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক কিশোর শাহরিয়ারকে ডেকে ঈদগাহ কাঁচা রাস্তার মোড় এলাকায় নিয়ে যায়। রাত নয়টার দিকে ওই কিশোরের এক বন্ধুর সঙ্গে আরেক দল কিশোরের হালিশহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ঈদবস্ত্র মেলায় ধাক্কাধাক্কি হয়। বিষয়টি নিয়ে দুই দল কিশোর ঈদগাহ কাঁচা রাস্তার মোড় এলাকায় জড়ো হয়। সেখানে যায় শাহরিয়ার।

গ্রেপ্তার কিশোরের বাবা রিকশার গ্যারেজের মিস্ত্রি। দুই ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। মা গৃহিণী। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ হলেও পরিবার থাকে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায়। সেখানে ওই কিশোরের বেড়ে ওঠা। কিশোরের বাবা জানান, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেয় ছেলে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর পড়াতে পারেননি। কিছুদিন কাজ শেখার জন্য কয়েকটি গ্যারেজে পাঠানো হয়। সেখান থেকেও চলে আসে। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরেফিরে সে দিন পার করতে থাকে। মুঠোফোন কিনে না দেওয়ায় নানা হুমকি–ধমকি দিয়েছিল। পরে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে একটি মুঠোফোনও কিনে দেওয়া হয়। তাঁর ছেলে ভালো হয়ে চলুক, সেটিই তাঁর চাওয়া।

স্কুলছাত্র শাহরিয়ার যেখানে খুন হয়, সেখানে দুই দলের ১০ থেকে ১২ জন কিশোর ছিল। তিনজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গায়ে ধাক্কা লাগা নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হচ্ছিল। হঠাৎ কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের একজন (গ্রেপ্তার কিশোর) তার প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বের শাহরিয়ারকে মারে। আরেকটি বের করে ইমনকে মারে। ইমন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অথচ ওই দুজনের সঙ্গে এই কিশোরের কোনো শত্রুতা নেই। তাদের সঙ্গে তার ধাক্কাও লাগেনি।

পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার কিশোর জানিয়েছে, অনলাইনে ছুরি দুটি ৩৫০ করে ৭০০ টাকায় কিনেছে সে। নিজের সঙ্গে ছুরি রাখলে তার নিজেকে কখনো হিরো আবার কখনো বড় বড় লাগে। তবে কাউকে মারার জন্য এগুলো রাখেনি। সেদিন বন্ধুদের সামনে নিজেকে হিরো দেখাতে সে ছুরিকাঘাত করেছে।

গ্রেপ্তার কিশোর কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত নয় বলে জানান নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মো. আবদুল ওয়ারীশ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিজেরা বন্ধুরা ঘোরাফেরা করে। টিকটক করে। কথিত কোনো বড় ভাইয়ের কবজায় এখনো পড়েনি। কবজা হলে হয়তো আরও বড় ধরনের অপরাধে জড়াত এসব কিশোর। এ জন্য সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে কী করে, পরিবারকে খেয়াল রাখতে হবে। বিপথগামী হওয়ার আগে শিশু–কিশোরকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এটি পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। অভিভাবকেরা যাতে সচেতন হন, সে ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে নানা প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

নগরের হালিশহর থানার মধ্য রামপুর ধোপাপাড়ার বাসিন্দা জহিরের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে শাহরিয়ার ছোট। নগরের মনসুরাবাদ গণপূর্ত বিদ্যানিকেতনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে সে। করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায় দেওয়ানহাট ছন্দু মিয়া মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগে তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয়। মো. জহির বলেন, ছেলেকে সব সময় নিজের সঙ্গে রাখতেন। এক বন্ধুর সঙ্গে ছেলে সেদিন ঘটনাস্থলে যায়। আর কোনো মা-বাবার বুক যাতে খালি না হয়, তাই সন্তানদের বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন