থার্মাল স্ক্যান মেশিনে ভারতীয় ট্রাক চালকের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপরে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের বাংলাদেশ ভারত শূন্যরেখায়
থার্মাল স্ক্যান মেশিনে ভারতীয় ট্রাক চালকের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপরে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের বাংলাদেশ ভারত শূন্যরেখায়প্রথম আলো

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ট্রাকে করে ভারতীয় পণ্য প্রবেশ করছে। বাংলাদেশে প্রবেশকালে বিজিবির চেকপোস্টে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো দাঁড় করানো হচ্ছে। এক আনসার সদস্য থার্মাল স্ক্যান মেশিনে ট্রাকচালক ও সহকারীর তাপমাত্রা মাপছেন। একজন এসে গাড়ির চাকাসহ পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করছেন। সবশেষে একজন এসে চালকের দিকে হাতল লাগানো একটি ঝুড়ি এগিয়ে দিচ্ছেন। চালক সেখানে গাড়ির চালানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখছেন। চালক ও সহকারী উভয়ের মুখেই মাস্ক লাগানো আছে।

প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্ন হলে গাড়ি গিয়ে থামছে শুল্কস্টেশন অফিসের গেটে। সেখানেও একইভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত হিলি স্থলবন্দর হয়ে বাংলাদেশের প্রবেশমুখে এই চিত্র দেখা যায়।

বিজিবি কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন শেখ বলেন, কয়েক দিন ধরে বন্দর এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তাঁরা। ভারতীয় গাড়ি থেকে কোনো চালক বা সহকারীকে নামতে দিচ্ছেন না। চালকের কাছে মালের চালানপত্রও নিচ্ছেন বিশেষ কায়দায়। তিনি জানান, গত এক মাসে দুজন চালকের শরীরের তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় বন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

default-image

অবশেষে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো বন্দরে প্রবেশ করে ওজন স্কেলে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। এতক্ষণ যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার লক্ষণ দেখা গেল, বন্দরের গেট দিয়ে প্রবেশ করে মুহূর্তেই যেন সব শেষ। ওজন শেষ করে ট্রাকগুলো যাচ্ছে পাথর পয়েন্টে, চালের পয়েন্টে কিংবা পেঁয়াজের পয়েন্টে। গাড়ি থেকে নেমে পড়ছেন চালক ও সহকারী। মাস্কবিহীন ঘুরছেন বন্দর এলাকায়। মিশে যাচ্ছেন বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

পানামা পোর্টের অভ্যন্তরে পশ্চিম প্রান্তে পাথর খালাস করলেন চালক আশীষ কুমার। পরে সেখানেই চালান জমা দেন। চালান গ্রহণকারী শাওন ও আশীষ দুজনের মুখেই মাস্ক নেই। জিজ্ঞেস করতেই পকেট থেকে মাস্ক বের করে দেখালেন আশীষ। চালান গ্রহণকারী শাওনের জবাব, ‘মাস্ক পরেই কি সমস্যার সমাধান হবে? আপনাকে কৈফিয়ত দেয়া লাগবি ক্যা?’ পরে বন্দর এলাকায় মোট ৩৭টি ট্রাক পরিদর্শন করা হয়। যার মধ্যে চারটি গাড়িতে চালকের উপস্থিতি ছিল এবং চালক, সহকারীসহ পাওয়া গেছে দুটি গাড়িতে।

default-image

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে করোনা মহামারির প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় দিনাজপুর বিশেষত হাকিমপুর উপজেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তার ওপর বন্দর এলাকায় করোনা প্রতিরোধে তৎপরতা নিয়েও উদ্বিগ্ন অনেকেই। এদিকে গত সপ্তাহে ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তিনজন। এর মধ্যে গত শনিবার একজন মারাও গেছেন।

হিলি স্থল শুল্কস্টেশনের উপকমিশনার সাইদুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে প্রায় এক বছর ধরে ইমিগ্রেশন বন্ধ থাকলে পণ্য পরিবহন চলছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০টি ভারতীয় বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রতিটি ট্রাকে চালক, সহকারীসহ সাড়ে তিন থেকে চার শতাধিক মানুষ প্রবেশ করছেন। আর এসব পণ্য খালাসের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ছয় শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক। শুল্ক কর্মকর্তার দাবি, স্বাস্থ্যবিধি মানাতে তাঁরা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। মাইকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বন্দর এলাকায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দুটি শৌচাগার এবং ভারতীয়দের জন্য একটি পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষকেও এখানে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ২৬ এপ্রিল দুপুরে পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেডের সভাকক্ষে হিলি স্থলবন্দরসংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা হয়। সভায় করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ১১টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়ন করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হিলি স্থলবন্দর পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

default-image

সভায় ভারতীয় গাড়িচালকদের স্যানিটাইজ করা, গাড়ি স্যানিটাইজ করা, পণ্য খালাস না হওয়া পর্যন্ত গাড়িতে অবস্থান করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রয়োজনে ভারতীয় গাড়িচালককে শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় কাগজ-কলম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করবে। পোর্টের কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধিদের হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, ক্যাপ, পিপিই পরিধান করে আসা চালক ও সহকারীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দলিলাদি বিনিময় করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শুল্ক অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, কাগজে-কলমে তো অনেক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এসবের বাস্তবায়ন করতে যাঁদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, তাঁরা কতটুকু বাস্তবায়ন করছেন?

default-image

স্থলবন্দর এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না, এ কথার জবাবে হিলি আমদানি রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কাজ করছি। তবে বন্দরের অভ্যন্তর এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি যেন সঠিকভাবে পালন করা হয়, সে বিষয়ে পোর্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেডের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন প্রতাপ মল্লিক বলেন, ‘বিদেশি ড্রাইভাররা কথা শুনতে চান না​। ইতিমধ্যে ভারতীয় অ্যাসোসিয়েশনে এ কথা পত্র মারফত জানানো হয়েছে। আমরা পৃথক তিনটি দল গঠন করেছি। তাঁরা সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দর এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখছেন। ড্রাইভারদের অনুরোধ করা হচ্ছে। দিনের গাড়ি দিনের মধ্যেই মাল খালাস করে ফেরত পাঠানো বিষয়ে আমার তৎপর আছি।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন