ঠাকুরগাঁওয়ে আলু চাষ
১০ বছরে ছয় বছরই লোকসান
প্রতি কেজিতে সাত-আট টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। তাই হিমাগার থেকে আলু বের করা নিয়ে শঙ্কা শুরু হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বাজারে প্রতিদিনই পাল্লা দিয়ে কমছে আলুর দাম। জাতভেদে প্রতি কেজি আলুতে কৃষকদের সাত-আট টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে হিমাগার থেকে আলু বের করা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কৃষকেরা বলছেন, গত ১০ বছরের মধ্যে ৬ বছরই তাঁরা আলুতে লোকসান দিয়েছেন। এর মধ্যে তিন বছরে অনেকে পুঁজি পর্যন্ত ফেরত আনতে পারেননি।
ঠাকুরগাঁও আলু চাষের জন্য বিখ্যাত। এখান থেকে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা আলু কিনে নিয়ে যান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় সূত্রমতে, ২০২০ সালে জেলায় ২৫ হাজার ৩৫ হেক্টর (এক হেক্টর সমান ২.৪৭ একর) জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। আলু উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ৭২০ মেট্রিক টন। সেবার বাজারে আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লাভ করেন। কৃষক আলু চাষে ঝুঁকে পড়েন। চলতি বছর কৃষক ২৮ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেন। ফলন পান ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন।
ঠাকুরগাঁওয়ে আলু সংরক্ষণের জন্য সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৫টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারের ১ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করার যায়, যা মোট ফলনের ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে কৃষকের উৎপাদিত অধিকাংশ আলুই সংরক্ষণের বাইরে থেকে যায়। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতিতে দেশের খাবারের হোটেলগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সেখানে আলুর ব্যবহার একেবারেই বন্ধ ছিল। এতে আলুর চাহিদা কমে যায়।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, অন্যবার এ সময়ের মধ্যে সাধারণত ৫০-৬০ শতাংশ আলু হিমাগার
থেকে বের হয়ে যায়। বাজারে চাহিদা না থাকায় এবার এখন পর্যন্ত ২৫ শতাংশ আলুও হিমাগার থেকে বের হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হিমাগারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি বস্তা আলুতে গড়ে ১০০ টাকা দাম কমেছে। বর্তমানে হিমাগারে প্রতি বস্তা (৬০ কেজি) অ্যাসটেরিক আলু ৬০০ টাকা ও ডায়মন্ড আলু ৬৬০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে আলুর উৎপাদন ও বাজার দর নিয়ে বিশ্লেষণ করে আসছেন ঠাকুরগাঁও ডেইরি লিমিটেডের চেয়ারম্যান নুরুল হুদা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আলুর সঙ্গে তিনটি পক্ষ সম্পৃক্ত—আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দশকের শুরুর তিন বছর ছিল আলুর জন্য দুর্যোগের সময়। দরপতনের কারণে ওই বছরগুলোতে আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ—সবারই ব্যাপক লোকসান হয়েছে। চলতি বছরটাও একই পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
চাষিদের লোকসান থেকে বাঁচাতে আলুভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে।আবু হোসেন, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
নুরুল হুদা আরও বলেন, গত ১০ বছরের মধ্যে ২০১২, ২০১৬, ২০১৯ ও ২০২০ সালে কৃষক আলুতে লাভ করেছেন। ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে লোকসান করেন। আর ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৭ সালে আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ—সবাই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাঁর আক্ষেপ, ‘আলুর দাম বাড়লে আমরা বলি, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে। আর কৃষক বছরের পর বছর লোকসান দিলেও কারও মুখে কোনো কথা থাকে না।’
জেলা হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবদুল্লাহ বলেন, সারা দেশেই এবার হিমাগারগুলোতে আলু পড়ে আছে। আলুর বাজারমূল্যের বিপর্যয় ঠেকাতে প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি, আলু রপ্তানির উদ্যোগ এবং সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে আলু যুক্ত করতে হবে।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন বলেন, এবার আলুর পাশাপাশি সবজিরও রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। তাতে হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলুর চাহিদা কমেছে। চাষিদের লোকসান থেকে বাঁচাতে আলুভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে।