বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন কেমন?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠন আছে, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে—যারা জঙ্গির মানসিকতা নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, অস্ত্রবাজি করছে। ক্যাম্পে এখন থমথমে পরিস্থিতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর আছে। আর্মড পুলিশ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দায়িত্বে। পাশাপাশি জেলা পুলিশ, র‍্যাব, সেনাবাহিনী তৎপর থাকলেও ভেতরের পরিস্থিতি কিন্তু থমথমে। আমরা যারা স্থানীয় জনগণ রয়েছি, ক্যাম্প এরিয়ার বাইরে চারপাশে, আমরাও শঙ্কিত। রোহিঙ্গারা এখন ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরসা, আল ইয়াকিনসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন আছে। নিজেদের মধ্যে যে অন্তঃকোন্দল, গোলাগুলির যে আওয়াজ, এ নিয়ে বাংলাদেশিরা শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। পরশু দিন আমরা গোলাগুলির আওয়াজ পেয়েছি, ক্যাম্পের এক কিলোমিটারের ভেতরে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য সেখানকার রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের লোকজন এই গোলাগুলি করছে।

মুহিবুল্লাকে আপনি কীভাবে দেখেন? তাঁকে কারা হত্যা করল?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: আসলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমাদের অবাধে আসা-যাওয়ার সুযোগ নেই। ক্যাম্প সরকারের নিয়ন্ত্রণে। যতটুকু জানি, মুহিবুল্লাহ ভালো মানুষ ছিলেন, বাংলাদেশের আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক মহলে তৎপর ছিলেন। রোহিঙ্গাদের স্বার্থে কাজ করছিলেন। তাঁর চিন্তা ছিল, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা সময় মুহিবুল্লাহ আরাকানে (বর্তমান রাখাইন রাজ্য) ফিরতেন এবং সেখানে স্বাধীন একটা মুসলিম আরাকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন হয়তো তাঁর মধ্যে ছিল।

গত সপ্তাহে আমেরিকা থেকে ক্যাম্পে এসে মুহিবুল্লাহ সফরের বিস্তারিত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের। অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্বদেশ প্রত্যাবাসন শুরু করার ইঙ্গিতও তিনি তখন দিয়েছিলেন। হয়তো এটাই তাঁর (মুহিবুল্লাহর) জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাক, সেটা যারা চাইছে না, এখানে থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাবে, মাদকের ব্যবসা করবে, সোনার ব্যবসা করবে, তারাই মুহিবুল্লাকে হত্যা করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী যে সংগঠনগুলো আছে, তাদের মাধ্যমে মুহিবুল্লাহে হত্যা করা হয়েছে। হয়তো সেখানে এনজিও, আইএনজিওরাও জড়িত থাকতে পারে। যেহেতু রোহিঙ্গা নিয়ে বিশাল ব্যবসার নেটওয়ার্ক, মানবতার সেবার নাম দিয়ে কত কিছু হচ্ছে সেখানে।

প্রায়ই ক্যাম্পের ভেতরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলিতে রোহিঙ্গার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে লালন–পালন করে কে?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা নিজের দেশে থাকতেও সংগঠিত ছিল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের কারণে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মধ্যে সেই মানবিকতা নেই। তাদের একটা অংশ উগ্র মনোভাবের। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগাযোগ থাকতে পারে, নইলে তাদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র কে দিচ্ছে? ১২-১৪টা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর টাকার উৎস এখন ইয়াবা ও সোনার ব্যবসা। ক্যাম্পে এই দুই ব্যবসা এখন রমরমা। ওই টাকায় গোষ্ঠীগুলো অস্ত্রশস্ত্র আনতে পারে। কিন্তু কীভাবে, সেটা বলতে পারব না।

মুহিবুল্লাহ বেঁচে নেই, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আমরা স্থায়ীভাবে থাকার জন্য জায়গা দিইনি, মানবিক কারণে একটা সময়ের জন্য দিয়েছি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আচার-আচরণ, কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে না, তারা ফিরতে চায়। স্থানীয়দের দাবি, জাতিসংঘের মাধ্যমে হোক কিংবা সরকারের মাধ্যমে—রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হোক। তাহলেই বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম রক্ষা পাবে, তারা শান্তিতে থাকতে পারবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে কাঁটাতারের বেড়া আছে, তারপরও ক্যাম্প ছেড়ে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে কেন?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: কাঁটাতারের বেড়া আছে, তারপরও রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে সত্য কথা। ভাসানচরে যেসব রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা হলো, সেখান থেকেও তিন ভাগের এক ভাগ পালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় অথবা ক্যাম্পে ফিরে আসছে। দালালের মাধ্যমে কিছু রোহিঙ্গা অবৈধ পথে নৌপথে মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছে। নারী–শিশু পাচার হচ্ছে। এগুলো নিয়ে আমরা স্থানীয়রা ভীতিকর পরিস্থিতিতে আছি। এমন কোনো কার্যকলাপ নেই, তারা করছে না। রোহিঙ্গাদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।

default-image

সন্ধ্যার পর ক্যাম্পগুলো অরক্ষিত থাকে, সন্ত্রাসীদের বিচরণ ও অপতৎপরতা বেড়ে যায়। আপনি ক্যাম্পের কাছাকাছি এলাকায় থাকেন। এ নিয়ে যদি কিছু বলেন…

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনি, রাতের বেলায় সেখানে আরসা, আল ইয়াকিনসহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তৎপর হয়ে ওঠে। সাধারণ রোহিঙ্গারা সন্ধ্যার পর ঘরে ঢুকে যায়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড রাতেই চলে। আশ্রয়শিবিরের ঘরগুলো দুর্গম পাহাড়ে, চিপা গলি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দেওয়া খুবই সহজ।

মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবউল্লাহ বলেছিলেন, তাঁর ভাইকে হত্যা করেছে আরসার লোকজন। তিনজনকে তিনি শনাক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু মামলা করলেন ‘অজ্ঞাতনামা’ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। কারণ কিছু জানেন?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: কারণ অবশ্যই আছে, তারা এখন ভীতিকর পরিস্থিতিতে আছে। মুহিবুল্লাহ প্রায় সময় ১০-২০ জন বডিগার্ড নিয়ে চলাফেরা করতেন। যখন তাঁকে মারতে এল, তখন বডিগার্ড ছিল না। আরসার সঙ্গে বডিগার্ডদের কয়েকজনের যোগাযোগ ছিল বলেও কানাঘুষা আছে। মুহিবুল্লাহর ওপর হুমকি–ধমকি আগেও ছিল, কিন্তু মুহিবুল্লাহ পাত্তা দেননি। এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রাখার একটি চক্র এই কাজ করতে পারে।

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আপনার মতামত কী?

জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিকল্প নেই। এর মধ্যে তিন বছর কেটে গেল, দীর্ঘ মেয়াদে রাখা হলে আমরা সমস্যায় পড়ে যাব। ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে থাকার জন্য যে জায়গা আমরা দিয়েছি, সেখানে ধারণক্ষমতায় হবে না। পরে তাদের বিভিন্ন জায়গা স্থানান্তর করতে হবে। তখন স্থানীয় জনগণের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মেলামেশা, বিয়েশাদি আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ব্যবসা–বাণিজ্য অবাধে করছে ওরা, আরও বাড়বে। সারা দেশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ছে ওরা এবং তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ সবকিছু মিলিয়ে আমরা ঝুঁকিতে পড়ে যাব। জীবনযাত্রার মানে ব্যাঘাত ঘটবে।

রোহিঙ্গারা যেন কাঁটাতার ডিঙিয়ে বাইরে যেতে না পারে, সে ব্যাপারে তৎপরতা চালাতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের বড় বড় যে ১০ হাজারের অধিক দোকানপাট রয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে। শরণার্থীদের থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা করছে সরকার, তারা ব্যবসা করবে কেন? এই ব্যবসা ঘিরেই যত সমস্যা। তারা ব্যবসা করে, মাদক ও সোনার চোরাচালান করে চাহিদার অতিরিক্ত টাকা পাচ্ছে, সে টাকায় অস্ত্র কিনছে, অবৈধ পথে খরচ করছে, সঙ্গে বাংলাদেশের ঝুঁকিও বাড়ছে। এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

প্রথম আলো : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন