বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ছোটবেলা থেকেই আর্থিক দুর্দশা ছিল তারকদের। বাবা অসুস্থ ছিলেন, কাজ করতে পারতেন না। বিঘাখানেক ফসলি জমি থাকলেও তাতে পাঁচজনের সংসারে খাবারের জোগান আসত না। সংসারে অন্য কোনো আয় না থাকায় সেই জমিও একসময় বন্ধক পড়ে যায়। বড় সন্তান হিসেবে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকেই মাথায় মাটির ঝুড়ি নিয়ে দিনমজুরের কাজে নামতে হয় তাঁকে। অন্যের বই নিয়ে চেয়েচিন্তে পড়তে গিয়ে পড়ালেখাটা অষ্টম শ্রেণির বেশি আর এগোয়নি।

আলাপে আলাপে তারক বললেন, ‘পরের বাড়িতে খাটাখাটনি করে কোনোমতে চলতে থাকলাম। এর মাঝে একটু সেলাইয়ের কাজ শিখলাম। পরে এক দূরসম্পর্কের মামার মাধ্যমে ঢাকায় গেলাম। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। ঢাকায় মিরপুরে ও নবাবগঞ্জে তাদের দুটি কারখানাতেই কাজ করেছি। গ্রামে তখন রোজ মজুরি ৫০-৬০ টাকা। ঢাকায় প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা আসত। ভালোই চলছিল, সংসারে সচ্ছলতা আসতেও শুরু করেছিল। তবে সেখানে কাজ করতে করতে স্বাস্থ্য ভারী হতে থাকে। দারুণ অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেলেও দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। পরে বাড়িতে চলে আসি। এরপর চিকিৎসার জন্য ভারতে যাই।’

ভারতে চিকিৎসা নেওয়ার একপর্যায়ে জমানো টাকা শেষ হতে থাকে তারকের। বাড়ি থেকে টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকও বসা কাজে না থেকে শারীরিক পরিশ্রম হয় এমন কাজ করতে বলেন। সেখানেই ফের খেত-খামারে, মানুষের বাড়িতে কাজ শুরু করে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে থাকলেন তারক। চার বছর পর দেশে ফেরেন। বিয়েও হয়। বেকার জীবন। আগের কোম্পানিতে পাওনা কিছু টাকাও তুলতে পারলেন না।

এর কিছুদিন পর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে খুলনা আসেন। বেছে নেন এই কাজ। তারক বলেন, ‘প্রথমে বাঁকে পানি বহনের সময় ঘাড়ে ফোসকা পড়ত। ঘাড় থেকে মাংস ছুলে যেত। গামছা দুই কাঁধে চেপে রেখে ভীষণ কষ্ট করে কাজ করতাম। রাত হলে কোনদিকে ফিরে শোব, তা আর বুঝতাম না। কিছুটা সয়ে গেলেও এখনো কষ্টের শেষ নেই। ঘাড়ে ব্যথা হয়। কাজ ছেড়ে বসার পর মনে হয় রিমান্ড থেকে ছেড়ে দিয়েছে।’

জীবন আর জীবিকা নিয়ে যেন হাঁপিয়ে উঠেছেন তারক। আক্ষেপ আর হতাশার সুরে বলেন, ‘কঠিন জীবন। ৩৫ বছর ধরে কাজ করছি, একই রকমভাবে চলছে। ম্যারাডোনা বল ধরেছে তো গোল দিতে হবে, কোনোদিন তকাতাকি নেই। এভাবে জীবন চলে! একটা মানুষ কতক্ষণ দৌড়াতে পারে। দৌড়েরও তো সীমা আছে।’

প্রতিদিন ফজরের সময় উঠে পানি দেওয়ার কাজ শুরু করতে হয় তারককে। কাজ থামে অনেক রাতে। বসে থাকার সময় নেই। সময়মতো পানি না দিতে পারলে বকাঝকা শুনতে হয়। পানি দেন বিভিন্ন হোটেলে, দোকানে এবং দুয়েকটা বাসায়। মানুষ তাঁকে ‘পানিওয়ালা’ বা ‘মালি দা’বলে ডাকে। একটি বাঁকের দুটি জারে ১৬ করে ৩২ লিটার পানি ধরে। প্রতিদিন ৬৫ থেকে ১০০ বাঁক পানি দিতে পারেন। ৩২ লিটার পানির জন্য পেয়ে থাকেন আট টাকা। এভাবে দিনে তার আয় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।

তারকের গ্রামে খাওয়ার পানির খুব সংকট। আইলার পর থেকে সংকটটা বেড়েছে। তারকের পরিবারকেও পানি কিনে খেতে হয় সেখানে। তাও শহরের চেয়ে বেশি দামে। ব্যাখ্যা দিয়ে তারক বললেন, ‘গ্রামে পানির কষ্টের শেষ নেই। হিসেব করে দেখেন এখানে আমি প্রতি লিটার পানি দেই ২৫ পয়সায়। বাড়িতে ৩০ লিটার ড্রামের পানি কিনি ৩০ টাকায়। তার মানে দেখেন গ্রামে চার গুণ বেশি দামে পানি কিনতে হচ্ছে।’

শহরে ছোট এক রুমে একাই থাকেন তারক। খান হোটেলে। গ্রামে বাড়িতে যান দেড় থেকে দুই মাস পর। তারক বললেন, ‘আর্থিক সচ্ছলতা আনতেই এই কঠিন জীবন। গ্রামে দুই সন্তান আর তাদের মা থাকে। বাচ্চারা পড়াশোনা করছে। গ্রামে কয়েকটা গরু কিনেছি। বন্ধকের জমি ফিরিয়ে নিয়েছি। একটা পুকুর কাটার মতো জমিও কিনেছি। একসময় তো ফিরে যাওয়াই লাগবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন