বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবা রকসেদ আলী ও মা হাজেরা বেগমের একমাত্র মেয়ে মাজেরা। সাত বছর বয়সে হঠাৎ মাথাব্যথা শুরু হয় তাঁর। ব্যথার যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে উঠত। অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। পরিবারের সবাইকে বিরক্ত করতে থাকেন। কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে যেতেন। নিরুপায় হয়ে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো তাঁকে। ধীরে ধীরে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। ১৩ বছর বয়সে মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার পাশাপাশি বাক্‌প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। একদিন কাজের সন্ধানে মা-বাবা বাইরে যান। এই সুযোগে মাজেরা খাতুন পায়ের শিকল ছিঁড়ে উধাও হয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায় না। এভাবে কেটে যায় ১৫টি বছর।

৬ অক্টোবর মোল্লাপাড়া গ্রামের গৃহবধূ মলেজান বেগম তাঁর মায়ের চিকিৎসার জন্য যান রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে তিনি মাজেরা খাতুনকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখতে পান। তাৎক্ষণিক মাজেরার মায়ের কাছে খবর পাঠান তিনি। মাজেরার মা ছুটে গিয়ে দেখেন, তাঁর হারিয়ে যাওয়া মেয়ে জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আছেন। কঙ্কালসার দেহের শুধু মুখমণ্ডল দেখে মেয়েকে চিনতে পারেন। মাকে দেখে মেয়েও চিনতে পারেন। কথা বলার সাধ্য না থাকলেও তিনি মাকে জড়িয়ে ধরেন।

ওই দিনই উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাজেরা খাতুনকে মোল্লাপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। খবর পেয়ে গ্রামের মানুষ তাঁকে একনজর দেখার জন্য জড়ো হয় তাঁদের বাড়িতে।

রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুঠিয়া সার্কেল) ইমরান জাকারিয়া বলেন, ‘পুঠিয়ায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে ছিলেন মাজেরা। স্থানীয় লোকজন গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাঁর মা তাঁকে চিনতে পেরে আমাদের সহযোগিতা চান। আমরা তাঁকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি।’

ওকে ফিরে পাওয়ার আশা করতাম, কিন্তু ভরসা পেতাম না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ওকে ফিরায়ে দিছেন। ধারকর্জ করে হলেও ওকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করতে চাই।
হাজেরা বেগম, মাজেরা খাতুনের মা

রোববার দুপুরে মোল্লাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাজেরা খাতুন মায়ের শোবার ঘরের বারান্দায় বিছানায় শুয়ে আছেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে মুখটা মলিন। সবাইকে ফ্যালফ্যাল করে দেখছেন। মা কাছে এলে বুকের মধ্যে যাওয়ার আকুতি করছেন। হাসিমাখা মুখে মা ঘন ঘন জড়িয়ে ধরছেন মেয়েকে।

হাজেরা বেগম বলেন, আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো তাঁর মেয়ে মাজেরাও সুস্থ ছিলেন। ছোটবেলায় তিনি খুব চঞ্চল ছিলেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। একসময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সব সময় আগলে রাখতেন। তাঁর বাবা ভিক্ষা করতেন। হাজেরা ধানের খলায় কাজ করতেন। মেয়েকে হারাতে চান না বলেই সকালে কাজে যাওয়ার সময় শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে যেতেন। কিন্তু একদিন শিকল ছিঁড়ে মাজেরা হারিয়ে যান।

হাজেরা বলেন, ‘ওকে ফিরে পাওয়ার আশা করতাম, কিন্তু ভরসা পেতাম না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ওকে ফিরায়ে দিছেন। ধারকর্জ করে হলেও ওকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করতে চাই। মাত্র দুই মাস আগে ওর বাবা মারা গেছে। ওকে দেখার খুব সাধ ছিল। আজ বাঁচি থাকলে খুব খুশি হতো।’

প্রতিবেশী শুকোদা বেগম (৫২) বলেন, ‘সেই ১৫ বছর আগে মাজেরা যেমন দেখেছিলাম, এখন সে রকম নেই। শুধু মুখটা দেখে চেনা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন অনাহারে থেকে শরীর শুকিয়ে গেছে ওর।’

স্থানীয় দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আবদুল হান্নান বলেন, এখন মেয়েটির উন্নত চিকিৎসা দরকার। চিকিৎসা করার সামর্থ্য তাঁর পরিবারের নেই। তাঁকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন। মেয়েটির জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা ও তাঁর মায়ের জন্য বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন