১৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ওয়ার্ডে জায়গা হচ্ছে না রিনা বেগমদের

শ্বাসকষ্টে ভুগে চিকিৎসা নিতে যশোর জেনারেল হাসপাতালে এসেছিলেন রিনা বেগম। রোগীর চাপে ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় তাঁর ঠাঁই হয় খোলা আকাশের নিচে। আজ মঙ্গলবার বেলা ১টায়।ছবি : প্রথম আলো

ষাটোর্ধ্ব রিনা বেগমের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়। করোনা সন্দেহে জরুরি বিভাগ থেকে তাঁকে আইসোলেশন (ইয়েলো জোন) ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু ওই ওয়ার্ডের ভেতরে কোনো জায়গা নেই। ওয়ার্ডের বাইরে খোলা আকাশের নিচেই তাঁকে শুইয়ে রাখা হয়। আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে গিয়ে দেখা গেল, ওয়ার্ডের বাইরেই আছেন রিনা বেগম।

যশোরের একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইয়েলো জোনে রিনা বেগমের মতো অনেকে ধুঁকছেন। ১৯ শয্যার এই ওয়ার্ডে রোগী আছেন ৯৯ জন। হাসপাতালের মেঝেতেও পা রাখার জায়গা নেই। ওয়ার্ডের বারান্দায় সারি সারি বিছানা ফেলে অন্তত ৩০ জনকে রাখা হয়েছে। দুর্গন্ধময় অত্যন্ত ঘিঞ্জি পরিবেশ। যেখানে রোগীরা ভালো থাকার চেয়ে খারাপই থাকছেন।

মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের সামনে খোলা আকাশের নিচে একটি টেবিলের ওপরে জায়গা হয়েছে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বসুন্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা রিনা বেগমের। তাঁর নাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি অনুনয় করে বারবার ওয়ার্ড বয়দের বলছেন, ‘রোগী নিয়ে আমরা কী করব, ওয়ার্ডে নেবেন নাকি বাড়িতে নিয়ে চলে যাব?’ উত্তরে একজন ওয়ার্ড বয় বললেন, ‘আপনাদের রোগীর করোনা পজিটিভ হয়েছে। তাঁকে রেড জোনে নিয়ে যাব, অপেক্ষা করেন।’

যশোর জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রেড ও ইয়েলো জোনে ছয়জন করে মারা যান।

রিনা বেগমের স্বামী মুদিদোকানি আবদুল আজিজ বলেন, ‘গতকাল রাত সাড়ে ১০টা থেকে রোগী নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে বসে আছি। নার্সদের সঙ্গে কথাই বলা যাচ্ছে না। শুধু অক্সিজেন দিয়েই তাঁরা দায়িত্ব শেষ করেছেন। কোনো চিকিৎসা-ওষুধপত্র নেই। সকালে একজন ডাক্তার এসে শুধু অক্সিজেন বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। হাসপাতালে এমনিতেই কোনো চিকিৎসা নেই। আমরা রোগীকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাব বলে ভাবছি।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৩ মার্চ থেকে চলতি বছরের ২৯ জুন পর্যন্ত ইয়েলো জোনে করোনার উপসর্গ নিয়ে ১৬৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে গত এক সপ্তাহের প্রতিদিনই গড়ে পাঁচজনের বেশি রোগী এই জোনে মারা যাচ্ছেন।

ইয়েলো জোন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আখতারুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে রেড জোনে জায়গা বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইয়েলো জোনে নতুন ওয়ার্ড সংযুক্ত করার মতো জায়গা হাসপাতালে ছিল না। তবে রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার জন্য হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্র ইয়েলো জোনে সংযুক্ত করে নতুন ২৪টি শয্যা বসানো হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নতুন ওই ওয়ার্ড প্রস্তুত হবে। এই ওয়ার্ডের মেঝেতেও বিছানা দিয়ে রোগী রাখা হবে। সব মিলিয়ে অন্তত ৬০ রোগীকে এই ওয়ার্ডে রাখা যাবে। তখন ইয়েলো জোনের পরিবেশ অনেক ভালো হয়ে যাবে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালের রেড ও ইয়েলো জোনে বর্তমানে ২৩৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রেড ও ইয়েলো জোনে ছয়জন করে মারা যান। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার উপসর্গ নিয়ে ইয়েলো জোনে ভর্তি হয়েছেন ৯৮ জন। প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে।