default-image

পাটকলশ্রমিক মনজু মিয়া কিছুদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ছিলেন। এখানে–সেখানে বসে থাকতেন। অন্যমনস্কভাবে কিছু চিন্তা করতেন। ৬ এপ্রিল রাতে তিনি আত্মহত্যা করেন। শুধু মনজু মিয়া নন, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১৬ মাসে আত্মহত্যা করেছেন ৫৩ জন।

বালিয়াকান্দি থানা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ৪১ জন। তাঁদের কেউ বিষপান করেছেন বা কেউ গলায় ফাঁস লাগিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ২৫ জন আর পুরুষ ১৬ জন। তবে তাঁদের মধ্যে কোনো শিশু নেই। এসব ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। কারণ উল্লেখ করা হয়েছে মানসিক সমস্যা, পারিবারিক কলহ, শারীরিক সমস্যা প্রভৃতি। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। পুরুষ আত্মহত্যাকারী সাতজন, নারী তিনজন ও শিশু দুইজন।

মনজু ছিলেন পাটকলশ্রমিক। তাঁর বাড়ি বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের ছাবনীপাড়া গ্রামে। কিছুদিন ধরে তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় সময়ই তিনি অন্যমনস্ক থাকতেন। ৬ এপ্রিল রাতে তিনি একটি আমগাছের ডালে রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘরে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। অবশেষে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরের দিন সকালে তাঁর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলাউদ্দিন হোসেন। তার বাড়ি নারুয়া ইউনিয়নের বাকসাডাঙ্গী গ্রামে। বাবার নাম রিয়াজুল ইসলাম। কিছুদিন ধরে সে রশি নিয়ে ঘুরে বেড়াত। শেষ পর্যন্ত গলায় রশি দিয়েই সে আত্মহত্যা করে।

নারুয়া ইউনিয়নের বাকসাডাঙ্গী গ্রামের রিয়াজুল ইসলামের ছেলে স্থানীয় হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আলাউদ্দিন (১৪) গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সে কয়েক দিন ধরে বলছিল, গলায় রশি লাগিয়ে ও বিষপান করলে মারা যায় না। সে গলায় ফাঁস নিলে বাড়ির লোকজন টের পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে আনলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের ইকোরজানা গ্রামের বাসিন্দা হালিমন বেগম (৩৫)। তাঁর স্বামীর নাম তোফাজ্জেল হোসেন প্রামাণিক। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। ২৭ মার্চ দুপুরে তিনি নিজের ঘরে আত্মহত্যা করেন। বিকেলে আড়ার সঙ্গে ওড়না দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় তাঁর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তারিকুজ্জামান বলেন, শুধু বালিয়াকান্দি নয়, আশপাশের উপজেলার কিছু গ্রামেও আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। পাশের ঝিনাইদহ জেলাও খুব আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকা। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও আত্মহত্যাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে আত্মহত্যার কুফল তুলে ধরা হয়। তবে আত্মহত্যার প্রবণতা রোধের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ।

রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইব্রাহিম টিটন বলেন, নানাবিধ কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। মূলত বিষণ্নতা, মানসিক সমস্যা, কর্মহীনতা, সুস্থ বিনোদনের অভাবে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। বিষণ্নতাসহ নানাবিধ মানসিক সমস্যার কারণে তাঁরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাঁরা বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আবার কর্মহীন মানুষও নিজেকে অযোগ্য মনে করেন। নিজের প্রতি অভিমান থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। আর শিশুদের জন্য স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হলে তারা আত্মহত্যা করে। শিশুদের জন্য খেলাধুলা, বড়দের স্নেহ–ভালোবাসা আত্মহত্যা থেকে দূরে রাখতে পারে। আর সবার জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সমস্যা সবার সঙ্গে শেয়ার করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন শেখাতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন