কাঁদতে কাঁদতে নাসিমা বেগম বলেন, ‘সকাল ১০টার দিকি হাসপাতালে গিইছি। দাঁড়াতি পারি না, স্যারগের কত কইছি, আমারে একখান টিকিট দেন। একটু দয়া করেন আমার মাথায় খুব যন্ত্রণা। কেউ শোনে না। গামছাটা মাথায় প্যাঁচায়ে লাইনে দাঁড়াইছি। দৌড়য়ে গিইছি ইমারজেন্সিতে, স্যার আমারে একখান টিকিট আইনে দেন, কেউ দেয়নি। কয় কি, বাড়ি চলে যাও, দাঁড়াতি হবে নানে, তুমি সুস্থ। তারপরও সিরিয়ালে দাঁড়াইছি। এক ঘণ্টা পর টিকিট পাইয়ে ডাক্তার দেখাইছি। আমার এই ব্যাগের মদ্ধি ১৯০০ টাহা ছিল। কমমেটিকস বেঁচা টাহা। কখন জানি আমার ব্যাগ কাইটে সব নিয়ে গেছে।’

বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাসিমা। ছেঁড়া ব্যাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘কে নিছে, আমি কিচ্ছু জানি না। এহেনদে কাইটে নিয়ে গেছে। আমার সব নিয়ে গেছে। আরও এক বিটির টাহা নিয়ে গেছে। কত জায়গায় গেছি, কান্নাকাটি করছি। দোতলায় অফিসারের কাছে গেছি। কেউ গুরুত্ব দেয় নাই। আমি কইছি, দয়া করে আপনারা ক্যামেরায় একটু দ্যাহেন, চোরটা আছে। আমার টাহা কয়ডা পাবানি। তা–ও সেরা দেহে নাই।’

হাসপাতালে এক বেলা দৌড়াদৌড়ি করে তিনি সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে থানায় আসেন। বাগেরহাট সদর মডেল থানায় গিয়েও কান্নাকাটি করে তাঁর হারিয়ে যাওয়া টাকা উদ্ধারে সহযোগিতা চান। তিনি বলেন, ‘আমি বলছি, স্যার একটু দয়া করেন। আপনারা কেউরে একটু প্যাটায় দেন। আমার টাহা কয়ডা চইলে গেছে। গরিব মানুষ, কষ্টের টাহা। তা–ও আসে নাই।’

নাসিমা বেগমের বাড়ি বাগেরহাট সদরের গোবরদিয়া এলাকায়। তাঁর স্বামী মুজিবর মৃধা ভাড়া নিয়ে ইজিবাইক চালান। নাসিমা বেগমের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের দেখা হয় বাগেরহাট প্রেসক্লাবের নিচে। বাগেরহাট মডেল থানা থেকে বেরিয়ে এ পথ দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রথম দেখায় তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে কত জনরে বললাম। কেউ আমার টাহা কয়ডা একটু উদ্ধার করে দেন। ও বাবা, আমার তো সব শ্যাষ। আমার কাছে তো আর কোনো টাহা নেই। কী দিয়ে বাজার করব আইজ। কী খাবানে বাজান রে…। আমি একটু তন্ময়ের (বাগেরহাট-২ আসনের সাংসদ) কাছে যাব। সে নাহি বাগেরহাটে নেই। আমি একটু চিকিৎসা হব, সেই টাহাডা নিয়ে গেল। ওই টাহা কয়ডা আমার সম্বল। হারায়ে পাগলের মতো হয়ে গেছি।’

দুই ছেলে আর দুই মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে ও দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন নাসিমা বেগম। তাঁরা আলাদা থাকেন। ছোট ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে একটি মাদ্রাসায়। সেই ছেলে, মেয়ের ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে নাসিমার অভাবের সংসার।

নাসিমা বেগমের অভিযোগের বিষয়ে বাগেরহাট সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমাদ্দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই নারীসহ দুজন তাঁদের ব্যাগ থেকে টাকা চুরি যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। আমরা ক্যামেরা দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্তের চেষ্টা করছি। এ হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসেন। এর মধ্যে কিছু সুযোগসন্ধানী লোকও ঢুকে পড়েছে। বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে আমাদের কর্মীদের হিমশিম খেতে হয়। এমন চুরির বিষয়ে আমরা তাঁদের সতর্ক থাকতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। ওই নারীর অভিযোগ খতিয়ে দেখছি। এমন ঘটনা রোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন