১৯৯০ সালে মেঘনা নদীর ওপর মেঘনা সেতু নির্মিত হয়। এরপর বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী নদী–তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে শিল্পকারখানা নির্মাণ শুরু করে। প্রথম শিল্পকারখানা করেছিল মেঘনা গ্রুপ ও আনন্দ ডকইয়ার্ড। নির্মাণকাজ শেষে ১৯৯২ সালে উৎপাদনে যায় মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল মিল। একই বছর জাহাজ নির্মাণ শুরু করে আনন্দ শিপ বিল্ডার্স। বর্তমানে মেঘনাঘাট এলাকায় শুধু মেঘনা গ্রুপেরই ৪২টি কারখানায় উৎপাদন চলছে। এখন এই এলাকায় রয়েছে ১২০টি ছোট, মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানা। এর মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা পেপার মিল, শাহজালাল পেপার মিল, মাগুরা পেপার মিল, টাইগার ব্র্যান্ড সিমেন্ট, হোলসিম সিমেন্ট, ফ্রেশ সিমেন্ট, হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াক্ফ), আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি, ইউনাইটেড সুগার মিল ও বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের পাঁচটি জাহাজ নির্মাণ ডকইয়ার্ড।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক (কারিগরি) কার্তিক চন্দ্র দাস বলেন, ‘মেঘনাঘাট এলাকায় শিল্পকারখানা করার শুরু থেকেই আমরা স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। এলাকাবাসী প্রথম থেকেই চেয়েছিল এখানে শিল্পকারখানা গড়ে উঠুক। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া এলাকার অধিকাংশ মানুষ শান্তিপ্রিয়। ফলে মেঘনাতীরের গ্রামগুলো এখন শিল্পকারখানায় ভরপুর হয়েছে। গ্রামগুলো শহরে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির ক্ষেত্র প্রসারিত হওয়ায় এলাকার বেকার সমস্যা দূর হয়েছে। এ এলাকায় এখন অভাব-অনটন নেই বললেই চলে।’

মেঘনাঘাটের চেয়েও কিছুটা পুরোনো কাঁচপুর এলাকায় শিল্পায়নের কাহিনি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্তে ১৯৮৮ সালে প্রথম শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। কাঁচপুর শিল্পনগরে এখন ছোট ও মাঝারি ২২০টি কারখানা রয়েছে। এখানে ভারী কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানায় বেশি।

মেঘনাঘাট এলাকার নোয়াব মিয়া (৭০) বলেন, নব্বই সালে মেঘনা সেতু চালু হওয়ার আগে এ অঞ্চলে ছিল সুনসান নীরবতা। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, নদীতে মাছ শিকার ও মেঘনাঘাটের ফেরিতে হকার হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জমির মূল্য বেড়ে যায়। স্থানীয় লোকজন পেশা পরিবর্তন করে শিল্পকারখানায় চাকরি নিতে শুরু করেন। অনেকে ঠিকাদারিসহ নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে ভাগ্য বদলে নিতে শুরু করেন।

এলাকাবাসী বলছেন, বর্তমানে মেঘনাঘাট এলাকার ৮০ শতাংশ মানুষ চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী। তাঁরা বিভিন্ন শিল্পকারখানায় চাকরি করছেন বা নিজেদের মতো করে ব্যবসা শুরু করেছেন। এর বাইরে অনেকের আয়ের বড় উৎস হয়েছে বাড়িভাড়া। স্থানীয় লোকজন নিজেদের জমিতে ভবন তুলে শিল্পকারখানাগুলোতে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছে ভাড়া দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা পাচ্ছেন। সার্বিকভাবে শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক অর্থনীতি মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে।

স্থানীয় পিরোজপুর ইউপির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান বলেন, ‘মেঘনাঘাট এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় মানুষের নানাভাবে আয় বেড়েছে। অনেকেই ধনী হয়েছেন এ কথা সত্য। কিন্তু ঠাসাঠাসি করে বসবাস, শব্দ, বায়ু ও নদীদূষণের কারণে ধীরে ধীরে এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। মানুষের জীবনযাত্রায় নানা ধরনের প্রভাব পড়ছে। গ্রামীণ পরিবেশ এখন আর নেই বললেই চলে। এ কারণে অনেকেই বাড়িঘর ভাড়া দিয়ে অন্যত্র গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন। পরিকল্পিত নগরায়ণই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এটিকে প্রাধান্য দিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

মেঘনাঘাটের চেয়েও কিছুটা পুরোনো কাঁচপুর এলাকায় শিল্পায়নের কাহিনি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্তে ১৯৮৮ সালে প্রথম শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। কাঁচপুর শিল্পনগরে এখন ছোট ও মাঝারি ২২০টি কারখানা রয়েছে। এখানে ভারী কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানায় বেশি। তৈরি পোশাককারখানার মধ্যে ওপেক্স অ্যান্ড সিনহা গ্রুপের ১০টি কারখানা, এসকোয়্যার গ্রুপ, অনন্ত ডেনিম, এস এ ফ্যাশন, ইপিলিয়ন গ্রুপের কারখানা অন্যতম। রয়েছে প্রসাধনসামগ্রী তৈরির প্রতিষ্ঠান কিউটের কারখানা, সিমেন্ট তৈরির প্রতিষ্ঠান লাফার্জ ও স্ক্যান সিমেন্টের কারখানা। এ ছাড়া অলিম্পিক বিস্কুট ও ব্যাটারির কারখানা, রহিম স্টিল মিল এবং অনেকগুলো খাদ্যপণ্যের কারখানা রয়েছে কাঁচপুরে।

কাঁচপুরের বদলে যাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুল হক (৭৭)। প্রবীণ এ ব্যক্তি জানান, এ এলাকায় আগে থেকেই চাষাবাদ কম হতো। তখন পরিত্যক্ত নিচু জমি ছিল বেশি।

ছিল বড় বড় জলাশয়। প্রচুর মাছ ধরা পড়ত। প্রতিবছর স্থানীয় লোকজন উৎসব করে মাছ ধরতেন। শীত মৌসুমে বিদেশি পাখিদের আগমনে ভরপুর থাকত জলাশয় ও গ্রামের গাছপালা। পাখির ডাক ছাড়া এলাকার সুনসান নীরবতা ভাঙানোর মতো কিছু ছিল না। সেই এলাকায় এখন মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে কলকারখানার অবিরাম আওয়াজ।

এলাকাবাসী বলছেন, বিশেষ করে গত ১৫ বছরে কাঁচপুরে শিল্পায়ন হয়েছে বেশি। একের পর এক শিল্পকারখানা নির্মিত হয়েছে এখানে। ফলে কাঁচপুর এলাকার দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের কারণে এলাকায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পকারখানাগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছে জমি বিক্রি করেছেন এলাকাবাসী। কারখানাগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা করে স্থানীয়দের আয় বেড়েছে। কাঁচপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ধনীর সংখ্যাই বেশি।

কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দা আবদুল মান্নান (৫৬) বলেন, ঢাকার অদূরে কাঁচপুরে শিল্পমালিকেরা বিনিয়োগ করার প্রধান কারণ ছিল নদীপথে ও সড়কপথে যোগাযোগের ভালো ব্যবস্থা ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা। শিল্পকারখানা নির্মিত হওয়ার পর মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ অঞ্চলে বেকারত্বের সংখ্যা খুবই কম।

ওপেক্স অ্যান্ড সিনহা গ্রুপের শ্রমিক নুরুন নাহার বলেন, ‘আমি ১৫ বছর এই এলাকায় বসবাস করছি। একদিকে বাসাভাড়া বেশি, অন্যদিকে গাদাগাদি করে বসবাস। শিল্পনগরী এলাকাটি এখন বসবাস করার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।’

কাঁচপুর ইউপির চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, এলাকায় শিল্পকারখানা থাকায় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বেড়েছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু শব্দ, বায়ু ও নদীদূষণ চরমে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ঠাসাঠাসি করে মানুষের বসবাস, ময়লা-আবর্জনাসহ নানা কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ। বর্তমানে এখানে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। এককথায় এলাকাটা বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শিল্পমালিকেরা যদি নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কারখানার শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে স্থানীয় ব্যক্তিদের দুর্ভোগ কিছুটা কমত।

গ্রামাঞ্চলেও ঢুকে পড়েছে শিল্পায়ন

এত দিন দুটি শিল্পাঞ্চলের চার শতাধিক শিল্পকারখানাই ছিল সোনারগাঁয়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। সেগুলো ছিল মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে। দিন দিন গ্রামাঞ্চলে ঢুকে পড়েছে শিল্পায়ন আর নগরায়ণ।

সোনারগাঁয়ে গত পাঁচ বছরে নির্মিত হয়েছে তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে টিপুরদী এলাকায় মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বৈদ্যেরবাজার এলাকায় আমান অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মেঘনা এলাকায় মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্থনৈতিক অঞ্চল। আমান অর্থনৈতিক অঞ্চল এখন পর্যন্ত শুধু সিমেন্ট উৎপাদন শুরু হয়েছে। অন্য দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বিভিন্ন শিল্পকারখানা পুরোদমে উৎপাদনে গেছে। এখানে তৈরি হচ্ছে খাদ্যপণ্য, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইলেকট্রনিক পণ্য, বেভারেজসহ নানা কিছু। শুধু এ তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চলেই এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

উপজেলার নিভৃত পল্লি হিসেবে পরিচিত বৈদ্যেরবাজার, বারদী ও জামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে শিল্পায়ন। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান হয়েছে মদনপুর-আড়াইহাজার সড়ক ও উদ্ববগঞ্জ-তালতলা সড়কের দুই পাশে। এর মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানা। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজারে তিন বছর আগে বিভিন্ন কারখানা করেছে মেঘনা গ্রুপ। বারদী এলাকায় হয়েছে বেঙ্গল সিমেন্ট কারখানা। জামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ১০টি মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। শান্ত সবুজ গ্রামগুলো এখন হয়ে উঠেছে বায়ু ও শব্দদূষণের কারখানা।

বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হাড়িয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৬১) বলেন, ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা শান্ত গ্রাম ছিল তাঁদের। এখন মানুষ ঘুমাতে যায় কারখানার শব্দ শুনে, ঘুম ভাঙেও একই শব্দে। মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ কলকারখানা ও শহুরে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিকুল ইসলাম বলেন, সোনারগাঁয়ে সব দিকে শিল্পকারখানা হয়েছে এবং হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে পুরো এলাকা আগামী ১০ বছরে শিল্পাঞ্চলে পরিণত হবে। শিল্পকারখানাগুলোর কর্তৃপক্ষের উচিত হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দ, বায়ু ও নদীদূষণের প্রতি লক্ষ রাখা। তা না হলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এলাকা।