বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রেড ক্রিসেন্ট ও জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২ সালে উপকূলীয় এলাকার জানমাল রক্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়। ওই সময় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ১৫টি ও হাতিয়ায় ১৮টি মাটির কিল্লা তৈরি করা হয়। এগুলো সমতল ভূমি থেকে ৩০ থেকে ৪৫ ফুট উঁচু। প্রতিটি কিল্লা নির্মাণের জন্য ৫ একর করে ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। দুর্যোগের সময় এসব কিল্লায় একসঙ্গে হাজারখানেক মানুষ আশ্রয় নিতে পারে।

নির্মাণের পর রেড ক্রিসেন্টকে কিল্লাগুলো তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ৩৩টি কিল্লার কারণেই ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে ভয়াবহ বন্যার সময় রক্ষা পেয়েছিল আশপাশের এলাকার মানুষ ও গবাদিপশু। পরবর্তী সময়ে কিল্লাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি না থাকায় গত এক দশকে কমপক্ষে ২৮টি কিল্লা বেদখল হয়ে গেছে। বাকি ৫টির মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চলতি বছরের ২৩ মে পুনরায় সংস্কার করা ২টি কিল্লা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এগুলো সুবর্ণচরের চর দরবেশপুর ও চর কাজি মোকলেস গ্রামে। ব্যয় হয় ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। হাতিয়ার তিনটি কিল্লা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার সব কটি মুজিব কিল্লা জরিপ করে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য ইতিমধ্যে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জরিপের কাজ দ্রুত শুরু হবে। সরকারি সম্পত্তি কাউকে দখল করে রাখতে দেওয়া হবে না।

সরেজমিনে তিন কিল্লা

সম্প্রতি সুবর্ণচরের উপজেলার চর আমানউল্যাহ, মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক ইউনিয়ন এলাকার কমপক্ষে তিনটি মুজিব কিল্লা ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। তিনটি কিল্লাই স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে নানা কাজে ব্যবহার করছেন।

চর আমানউল্যাহ ইউনিয়নের কাটাবুনিয়া এলাকায় চরজব্বর-চেয়ারম্যানঘাট সড়কের পাশে মুজিব কিল্লায় স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম নামের এক ব্যক্তি গড়ে তুলেছেন বিশাল মুরগির খামার। সড়কের পাশে তিনি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে পুরো জায়গাটি দখলে নিয়েছেন।

আবুল কাশেম প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তিনি ওই জায়গা প্রায় ২০ বছর আগে অন্য একজনের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। কেনার সময় তিনি কাগজপত্রে মুজিব কিল্লার কোনো অস্তিত্ব পাননি। তিনি ব্যক্তিমালিকানা সম্পত্তি কিনেছেন বলেও দাবি করেন।

একইভাবে মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চর তোরাব আলীর মুজিব কিল্লায় গিয়ে দেখা যায়, কিল্লার চারপাশের অর্ধেকের বেশি জায়গা স্থানীয় তিন-চারজন দখল করে রেখেছেন। বাকি জায়গায় গাছপালা কেটে সেখানে শাকসবজি চাষ করছেন আরও কয়েকজন।

চরক্লার্ক ইউনিয়নের চর আলাউদ্দিন এলাকার কিল্লার পাশের গড়ে উঠেছে বাড়িঘর। কিল্লার পাশের বিশাল পুকুরের মাঝখানে বাঁধ দিয়ে তা নিজেদের দখলে নিয়েছেন বাড়ির মালিক নুর উদ্দিন ওরফে জামাল। জানতে চাইলে তিনি বলেন, জায়গাটি এক নারী কয়েক বছর আগে ভূমি অফিস থেকে ‘নথি বন্দোবস্ত’ নিয়েছিলেন। তিনি ওই নারীর কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। তবে ওই নারীর পরিচয় কিংবা এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জেলা ইউনিটের প্রধান আবদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, মুজিব কিল্লার সব সম্পত্তি সরকারের। বিভিন্ন ব্যক্তি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সেগুলো দখল করে রেখেছেন। সম্প্রতি সরকার মুজিব কিল্লার সম্পত্তির বহুমুখী ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার চাইলে দখল হওয়া ভূমি সহজে ফিরে পেতে পারে।

উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা জানায়, হাতিয়ার ১৮টির মধ্যে ৩টি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি ১৫টি দখল হয়ে গেছে নানাভাবে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব জায়গা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন।

উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করা সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী রফিক উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রাণ রক্ষায় এই মুজিব কিল্লাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু এখন আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ায় মানুষ কিল্লায় বেশি যায় না। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে এগুলো দখল হয়ে গেছে। এসব কিল্লা ব্যবহারের উপযোগী থাকলে মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হতো। এগুলো খুব দ্রুত দখলমুক্ত করা দরকার।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন