এদিকে সাত-আট মাস কেটে যাওয়ার পরও জোয়াদ মিয়া বাড়ি না ফেরায় স্বজন ও গ্রামের লোকজন তাঁকে নানা জায়গায় খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। পরে তাঁর সন্ধান মেলে নেত্রকোনার খালিয়াজুরি এলাকায়। কিন্তু তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। স্বজনেরা তাঁর সন্ধান পাওয়ায় সেখানকার জমিজমা বিক্রি করে আবার অজ্ঞাতবাসে চলে যান তিনি। এরপর ৩৩ বছর কেটে গেলেও জোয়াদ মিয়াকে আর খুঁজে পাননি পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা ধরে নেন, জোয়াদ আর বেঁচে নেই। সবাই ভুলে যান জোয়াদ মিয়াকে।

জোয়াদ মিয়ার বড় ছেলে নিভিয়াঘাটা গ্রামের মো. লিটন মিয়া (৪০)। বাবা (জোয়াদ মিয়া) তাঁর নাম রেখেছিলেন মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, বাবা তাঁর নাম আলমগীর হোসেন রেখেছিলেন, সেটা তিনি জানতেন না। পাঁচ-ছয় বছর আগে এলাকার ডাকপিয়ন তাঁকে জানিয়েছিলেন, আলমগীর হোসেন, পিতা জোয়াদ মিয়া নামে একটি চিঠি এসেছে। কিন্তু তিনি (ডাকপিয়ন) গ্রামে এই নামে কাউকে পাননি। চিঠির ঘটনাটি লিটন তথা আলমগীরের মনে দাগ কাটলেও বাবা নিখোঁজ থাকায় বিষয়টি তিনি ভুলে যান।

এদিকে বাবার সন্ধান না পেয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ যাবতীয় কাগজপত্রে সন্তানেরা জোয়াদ মিয়াকে ‘মৃত’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ৩৩ বছর পর বাবা হঠাৎ বাড়ি ফেরায় কী করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা।

বাড়ির বারান্দায় বসে জোয়াদ মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়ি ছাড়ার পর তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। কীভাবে স্মৃতি হারালেন তা বলতে চাননি তিনি। তখন প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও সন্তানদের কথা তাঁর মনে ছিল না। তিনি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার গ্রামের এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানকার এক কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে তিনি বিয়ে করেন। শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে থাকতেন। সেই সংসারে তাঁর এক ছেলে ও ছয় মেয়ে আছে। চার মেয়েকে বিভিন্ন এলাকায় বিয়ে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ের স্বামী মৌলভীবাজার জেলা সদরের বাসিন্দা মো. আতাউর রহমান। পেশায় তিনি একজন মিস্ত্রি। শ্বশুরের সঙ্গে তিনিও নান্দাইলের নিভিয়াঘাটা গ্রামে এসেছেন। আতাউর রহমান বলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগে তাঁর শ্বশুর (জোয়াদ মিয়া) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন অবচেতন মনে তিনি নান্দাইল উপজেলার নিভিয়াঘাটা গ্রামে তাঁর স্ত্রী-পাঁচ সন্তানের কথা বলেন। এটা শুনে দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানেরা হতবাক হয়ে যান। তবে আবার স্মৃতি হারাতে পারেন ভেবে পুরোনো কথা বলার জন্য তাঁকে কেউ চাপ দেয়নি। তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে নিজের ইচ্ছায় সবকিছু খুলে বললে তিনি শ্বশুরকে নিয়ে নান্দাইলে আসেন।

জোয়াদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রামে ঢুকে দেখি, গত ৩৩ বছরে সবকিছু বদলে গেছে। ছোটরা বড় হয়ে গেছে। যেসব সন্তানকে সাত-আট বছরের রেখে গিয়েছিলাম, তাঁদের মুখে কাঁচা-পাকা দাঁড়ি।’ জোয়াদ মিয়ার স্ত্রী রেজিয়া খাতুন বলেন, ‘স্বামীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে জীবন থেকে তাঁর ৩৩টি বছর হারিয়ে গেছে। এখন আর চাওয়া-পাওয়ার কীই–বা বাকি আছে।’

জীবনের বাকি সময় কাদের সঙ্গে কাটাতে চান, প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণ ভেবে জোয়াদ মিয়া বলেন, দুই পক্ষের সংসারের মানুষগুলোর সঙ্গে থাকতে চান। এ জন্য হয়তো তাঁকে কয়েক দিন পরপর দুই জায়গায় আসা-যাওয়া করতে হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন