‘৪২ বছর পর কোথাও বেড়াতে আসলাম, খুব ভালো লাগছে’

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী যুব সংঘের উদ্যোগে ষাটোর্ধ্ব ৫০ ব্যক্তি যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে মধুপল্লিতে বনভোজনে আসেন। আজ বুধবার সকালে
ছবি: প্রথম আলো

যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে মধুপল্লিতে বনভোজনে এসে ৮১ বছর বয়সী সিরাজুল ইসলাম দারুণ খুশি। মুহূর্তের জন্য হলেও চাঙা হয়ে উঠেছেন। এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। শরীরটা ক্লান্ত হয়ে এলে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছেন। আবার হাঁটছেন। ঘুরতে আসা ষাটোর্ধ্ব গোলাম সরোয়ারের মুখেও খুশির ঝিলিক। তাঁদের সঙ্গে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে বনভোজনে এসেছেন আরও অনেক প্রবীণ। এই বয়সে বনভোজনে আসতে পারায় যারপরনাই আনন্দিত তাঁরা। আজ বুধবার ব্যতিক্রমী এই বনভোজনের আয়োজন করেছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী যুব সংঘ।

চাপালী যুব সংঘ এই বনভোজনে গ্রামের ষাটোর্ধ্ব ৫০ জনকে মধুপল্লিতে নিয়ে যায়। তাঁদের সবার গায়ে ছিল হলুদ রঙের গেঞ্জি, মাথায় নীল রঙের টুপি। মধুপল্লিতে বুধবার সকালে তাঁরা পৌঁছালে প্রথম আলোর বন্ধুসভার সদস্যরা ফুল ও মিষ্টি দিয়ে তাঁদের বরণ করেন। সবাইকে ঘুরিয়ে দেখানো হয় সাগরদাঁড়ি এলাকা। এমন আয়োজনে দারুণ খুশি ষটোর্ধ্বরা। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও চাঙা হয়ে ওঠেন তাঁরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর কেশবপুর বন্ধুসভার সভাপতি দীপ্ত রায় চৌধুরী, সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান ও শরিফুল ইসলাম।

বনভোজনে আসা ৮৮ বছর বয়সী শফি উদ্দীন শেখ বলেন, ‘এই বয়সে যে এইভাবে বেড়াতে আসব, ভাবতেই পারি না। সর্বশেষ গিয়েছিলাম কক্সবাজারে, ১৯৭৯ সালে। ৪২ বছর পর কোথাও বেড়াতে আসলাম। খুব ভালো লাগছে।’ ষাটোর্ধ্ব বদরউদ্দীন সরদার বলেন, ‘ক্লাবের বর্তমান পরিচালনাকারীরা আমাদের নিয়ে আসবে ভাবতেও পারেনি। আমি কত যে খুশি, তা ভাষায় বলতে পারছি না।’

মধুপল্লিতে পৌঁছালে বৃদ্ধদের ফুল ও মিষ্টিতে বরণ করে নেয় কেশবপুর বন্ধুসভা
ছবি: প্রথম আলো

চাপালী যুব সংঘের ইতিহাস তুলে ধরে সিরাজুল ইসলাম বলেন, তরুণ বয়সে ১৯৭১ সালে তাঁরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চাপালী যুব সংঘ। যুদ্ধ শুরু হলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালাতে শুরু করে। আবার শহরতলি ছেড়ে অনেকে চলে যায় গ্রামাঞ্চলে। সেই সময়ে তাঁরা তরুণেরা গ্রামটিকে রক্ষা করতে গ্রামের মানুষকে বাঁচাতে একত্র হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই সংগঠন। অর্ধশত বছর পেরিয়ে সংগঠনটির বয়স এখন ৫১ বছর। এই দীর্ঘ সময় পর আবার তাঁরা একত্র হতে পেরেছেন। একসঙ্গে বনভোজনে আসতে পেরে ষাটোর্ধ্ব সবাই খুব খুশি।

বয়োজ্যেষ্ঠদের বনভোজন সম্পর্কে ক্লাবের সভাপতি আজাদ রহমান বলেন, ক্লাব থেকে তাঁরা প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরতে যান। এবারও তাঁরা ১২ মার্চ পদ্মা সেতু দেখতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয় বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য এই বিনোদন দেওয়া যায় কীভাবে। যাঁরা এখন আর ঘুরতে যেতে পারেন না, তাঁদের নিয়ে কেউ ঘুরতেও যেতে চান না। শেষে ষাটোর্ধ্বদের নিয়ে একটি বনভোজন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত থেকে ষাটোর্ধ্ব ৫০ জনকে নিয়ে এসেছেন সাগরদাঁড়িতে।

এই বনভোজনে ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য মো. শাহজাহান বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। তাঁরা ভাবেননি বৃদ্ধ মানুষের জন্য এমন আয়োজন হতে পারে। এই আয়োজনে তাঁরা সাড়া দিয়েছেন, মনের আনন্দে এসেছেন।

মধুপল্লির কাস্টডিয়ান আইরিন পারভীন বলেন, অনেকে এই মধুপল্লিতে আসেন। তবে এ-জাতীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের আসতে দেখে তিনি খুবই খুশি। এমন আয়োজন খুবই ব্যতিক্রম। বয়স্ক লোকজন এত কষ্ট সহ্য করে এই দূরের রাস্তায় বনভোজনে এসেছেন, এটা ভাবা যায় না। তাঁদের এই ঘুরতে আসা, দেশকে জানতে অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।