কাঠ চেলাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে কথা হলো আকবরের সঙ্গে। পুরো নাম মো. আকবর আলী গাজী। বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনির বড়দল গ্রামে। বাবার কিছু কৃষিজমি থাকলেও আর্থিক অনটন ছিল। পুরো এলাকাজুড়ে একই অবস্থা। জীবিকার সন্ধানে অচেনা শহরে পা রাখেন তিনি। দেশ স্বাধীনের কিছুদিন পর যখন খুলনা শহরে আসেন, আকবর তখন ২৩-২৪ বছরের তরুণ। কিছুদিন ঘোরাঘুরির পর জেলখানা ঘাট এলাকায় কাঠের গোলায় কাজ শুরু করেন। সে সময় জেলখানায় ও পুলিশ লাইনে কাঠ সরবরাহ করতেন। সময়-সময় জায়গা বদলালেও সেই থেকে আজ অবধি কাঠ চেলাই করে যাচ্ছেন। মাঝে একবার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তবে সহজ-সরল জীবনে অভ্যস্ত আকবর ব্যবসার জটিল মারপ্যাঁচ বুঝে উঠতে পারেননি।

কিছুক্ষণ টানা কাঠ কাটার পর একটু দাঁড়িয়ে নিয়ে হাসিমুখ করে আকবর বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল ২১-২২ বছর। তাইলি বয়স কম হুইয়েছে? এট্টু কষ্ট হুইয়ে যায় এখন। আমার জীবনে আর কোনো কাজ করিনি। অন্য কাজ করতি ভালো লাগে না। এইটেই ভালো লাগে। অবশ্যি অন্য কাজ পাইরে উঠিনে। পড়ালেখাও জানিনে। হিসাব–কিতেব ওভাবে বুঝিনে। ব্যবসাট্যাবসা আমার দ্বারা হোয়নি।’

গল্পে গল্পে আকবর বললেন, প্রতিদিন ফজরের আজানের পর কাঠ চেলাই করতে চলে আসেন গোলায়। মাঝে খাওয়ার বিরতি বাদে এশার আজানের সময় পর্যন্ত কাজ করেন। কোনো কোনো দিন আরও বেশি সময় দেওয়া লাগে। প্রতি মণ কাঠ চেলাই করে পান ২০ টাকা। শহরে প্রথম এসে যখন কাঠ চেলাই শুরু করেছিলেন, তখন মণপ্রতি ৭৫ পয়সা পেতেন। এক মণ কাঠ ফাড়লে দেড়-দুই কেজি চাল হতো। এখন এক মণে আধা কেজি চালও হচ্ছে না।

কয়েক বছর আগে চেলাই না করা কাঠ ৮০-৯০ থেকে ১২০ টাকা মণ ছিল। দু-তিন বছর ধরে বেশি চলছে। মাঝে আবার একটু কম ছিল। গ্যাসের দাম বাড়ায় আবার কাঠের দাম বেড়েছে। কাঠের দাম অনেকটা গ্যাসের দামের সঙ্গে ওঠানামা করে।
আকবর

আকবর জানান, গোলার মালিক অন্যজন। তিনি শুধু চেলাই করে প্রতি মণে ২০ টাকা পান। প্রতিদিন ৪০ মণের মতো কাঠ চেলাই করেন। মাঝেমধ্যে দু-এক দিন একটু কম-বেশি হয়। জোয়ানকালে প্রতিদিন ১০০ মণের বেশি কাঠ ফেড়েছেন তিনি। এখন বয়স হয়ে গেছে। তাই এত পারেন না। তবে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা উপার্জনের চেষ্টা থাকে তাঁর।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আকবর বলে ওঠেন, ‘দাম তো সবকিছুর বাড়তি। এর কম ইনকাম করলি চলবে কীভাবে?’ নিজের প্রশ্নের উত্তর আবার নিজেই দেন, ‘দাম বাড়লি আমি তো ঠেকাতি পারব না। কাজ যেহেতু করতি পারি। দেশের লোক বাঁচলি আমিও বাঁচপো।’ ৫০ বছর ধরে একই কাজ করছেন, অন্যের কাঠের গোলায় কাজ না করে নিজের ব্যবসা করতে ইচ্ছা জাগেনি? এমন প্রশ্নের উত্তরে আকবর বলেন, ‘এত বছর ধরে কাজকাম করে খেয়েপরে চলছি। এই তো ভালো। চাইলেই তো হবে না। এ ব্যবসা মূলত সরকারি জায়গায় রাস্তার পাশেই হয়। আমরা জায়গা পাব কোথায়? এলাকায় প্রভাব থাকা লাগে।’

আলাপে আলাপে জানা গেল, এখন বাসাবাড়িতে কাঠের চাহিদা কমেছে। চেলাই কাঠগুলো মূলত মিষ্টির দোকানে যায়। খুচরা ক্রেতারাও এসে দুই-চার কেজি করে কেনেন। কাঠের ফড়িয়ারা ট্রাকে করে কাঠ দিয়ে যান। কাঠের সেই গুঁড়ির দাম এখন প্রতি মণ ১৭০ টাকার মতো। কাঠ গোলায় আসার পর কিছুটা শুকিয়ে যায়। গায়ে লেগে থাকা মাটি ঝরে যায়। চেলাই করার পর তা বিক্রি হয় ২৫০ টাকা মণ।

আকবর বলেন, কয়েক বছর আগে চেলাই না করা কাঠ ৮০-৯০ থেকে ১২০ টাকা মণ ছিল। দু-তিন বছর ধরে বেশি চলছে। মাঝে আবার একটু কম ছিল। গ্যাসের দাম বাড়ায় আবার কাঠের দাম বেড়েছে। কাঠের দাম অনেকটা গ্যাসের দামের সঙ্গে ওঠানামা করে।

আকবর আলীর তিন মেয়ে। তিন মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী আর ছোট মেয়ের সন্তানকে নিয়ে গল্লামারী এলাকায় একটি ছোট্ট টিনশেডের বাসায় ভাড়া থাকেন। জমানো টাকায় শহর থেকে দূরে বটিয়াঘাটার দেবীতলা এলাকায় একটুকরা জায়গা কিনেছেন। অবশ্য শহরে একখণ্ড জায়গা কেনার শখ ছিল। আট বছর আগে জায়গা কেনার জন্য একজনকে সাড়ে তিন লাখ টাকাও দিয়েছিলেন। সেই লোক পরে জমি দেননি। উল্টো টাকা আদায় করতে গিয়ে ৭০ হাজার টাকা খরচা হয়ে গেছে।

মনে আক্ষেপ থাকলেও প্রশান্তি নিয়ে আকবর বলেন, ‘গরিবরে সবাই ঠকাতি চায়। কাজ কুইরে খাই, ভালো আছি। কাজ না করলি কেউ চার আনা পয়সা দেবে না। আর আল্লার রহমতে কোনো অসুখবিসুখ নেই। যদ্দিন কাজ করার খমতা থাকবে, কাজ কুইরে যাব।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন