default-image

মাধ্যমিক পাস করেছেন ১৯৬৫ সালে। উচ্চমাধ্যমিক ১৯৭০ সালে। এরপর যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়। মাঝে ১৯৮৫ সালে স্নাতক ও ১৯৮৭ সালে পাস করেন বিএড। অবসর নেন ২০০৮ সালে। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৩ বছর। এরপরও থেমে থাকেননি। উচ্চশিক্ষার আগ্রহ থেকে ২০১৭ সালে ভর্তি হন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সান্ধ্যকালীন স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) কোর্সে। এতে শুধু সফলই হননি, সবাইকে তাক লাগিয়ে এমএসএস চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষে সিজিপিএ ৩ দশমিক ৩৫ পেয়ে হয়েছেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম।

শিক্ষায় অনুরাগী ও হার না–মানা মানুষটির নাম রওশন আলী (৭৩)। বাড়ি পাবনা জেলা সদরের চরতারাপুর ইউনিয়নের তারাবাড়িয়া গ্রামে। কর্মজীবনে জেলার সুজানগর উপজেলা সদরের শহীদ দুলাল পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অবসর গ্রহণের পর থাকছেন নিজ বাড়িতেই।

রওশন আলী জানান, তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালে। মা–বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। ফলে বাবা তাঁকে বাড়ির বাইরে যেতে দিতে চাইতেন না। তবে ছোটবেলা থেকেই উচ্চশিক্ষার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। মাধ্যমিক পাস করার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে ভেবেছিলেন উচ্চশিক্ষার সাধ বুঝি পূরণ হলো না। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পরেই পাস করেন উচ্চমাধ্যমিক। এরপর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন শহীদ দুলাল পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। কর্মজীবনের ব্যস্ততাতেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ তাঁকে নাড়া দিতে থাকে। ফলে চাকরিরত অবস্থায়ই প্রাইভেট প্রোগ্রামের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে স্নাতকে (ডিগ্রি পাস কোর্স)। পাস করেন ঠিকঠাকমতোই। দুই বছর পরই শেষ করেন বিএড কোর্সও।

অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষকের দুই ছেলে। একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। অপরজন পাবনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন। দুই ছেলের ঘরে চারজন নাতি-নাতনি রয়েছে। বড় নাতনি এসএসসি পরীক্ষা দেবে। নাতি-নাতনির সঙ্গেই পড়ালেখা ও সময় কাটে তাঁর।
বিজ্ঞাপন

এরপর পেশাগত দায়িত্ব পালনেই ব্যস্ত সময় কেটেছে রওশন আলী। তবে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পাস করার ইচ্ছা দমেনি তাঁর। হঠাৎ করেই একদিন চোখে পড়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সের বিজ্ঞাপন। কোনো কিছু না ভেবেই ভর্তি হয়ে যান কোর্সে। নিয়ম মেনে করতে থাকেন ক্লাস। অংশ নেন পরীক্ষায়। গত ৮ নভেম্বর তাঁর চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। রওশন আলী পাস করেছেন ওই বছরের সন্ধ্যাকালীন কোর্সের সেরা ছাত্র হিসেবে।

অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষকের দুই ছেলে। একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে জেলা সদরের একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। অপরজন ঢাকা হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে পাস করে পাবনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন। দুই ছেলের ঘরে চারজন নাতি-নাতনি রয়েছে। বড় নাতনি এসএসসি পরীক্ষা দেবে। নাতি-নাতনির সঙ্গেই পড়ালেখা ও সময় কাটে তাঁর।

যত দিন বেঁচে আছি, শিক্ষা নিতে চাই। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমফিল করার অপেক্ষায় আছি। ঠিকঠাকমতো এমফিল শেষ করতে পারলে ইচ্ছা আছে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের।
রওশন আলী, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ৭৩ বছর বয়সে স্নাতকোত্তরধারী

রওশন আলী প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার কোনো বয়স নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সময়। মানুষের জন্য, সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে তিনি সমাজকর্ম বিষয়ে পড়ার আগ্রহ পেয়েছিলেন। এত ভালো ফল করবেন জানতেন না। তবে নিয়মিত ক্লাস করতেন। শিক্ষকেরা যা বলতেন, তা লিখে আনতেন। বাড়িতে এসে নিয়মিত সেগুলো বুঝে পড়তেন। এ জন্যই ভালো ফল করতে পেরেছেন বলে মনে করেন তিনি।

এই বয়সে এত ভালো ফলাফল সত্যিই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তবে তিনি ভালো ফল করবেন, এটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। ভর্তির পর থেকেই পড়ালেখার বিষয়ে তাঁর মধ্যে চরম আগ্রহ দেখা গেছে। কোনো দিন তিনি ক্লাস বাদ দেননি। নিয়মিত প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
আওয়াল কবির, সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সের সমন্বয়কারী শিক্ষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যত দিন বেঁচে আছি, শিক্ষা নিতে চাই। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমফিল করার অপেক্ষায় আছি। ঠিকঠাকমতো এমফিল শেষ করতে পারলে ইচ্ছা আছে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের।’

রওশন আলীর এই সাফল্য বিষয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও ২০১৭-১৮ সেশনে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সের সমন্বয়কারী শিক্ষক আওয়াল কবিরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বয়সে এত ভালো ফলাফল সত্যিই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তবে তিনি ভালো ফল করবেন, এটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। ভর্তির পর থেকেই পড়ালেখার বিষয়ে তাঁর মধ্যে চরম আগ্রহ দেখা গেছে। কোনো দিন তিনি ক্লাস বাদ দেননি। নিয়মিত প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ফলে ভালো ফল করতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি। তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন বলেও আশা রাখি।’

রওশন আলীর ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রীতম কুমার দাস বলেন, ‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ ছাড়েননি। কঠোর অধ্যবসায় করে ভালো ফল করেছেন। এটি যেমন অনুকরণীয়, তেমন অনুপ্রেরণারও বিষয়। আমরা তাঁর সাফল্য কামনা করি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0