default-image

দুই হাত উঁচু করে বুকসমান পানি ঠেলে আসছিলেন তিনি। হাতে পলিথিন মোড়ানো কাপড়। সড়কে ওঠার পর ভেজা কাপড় দ্রুত বদলালেন। এভাবে আসা-যাওয়া রোজ করেন কি না, জানতে চাইলে সহাস্যে বলেন, ‘আমরা তো পানির লকডাউনে আছি। নাও না থাকলে এই ভাবেই চলত অইব চাইর মাস।’

সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক লাগোয়া সালুটিকর এলাকায় গত শনিবার এভাবে দেখা যায় বুরহানউদ্দিনকে (৩৫)। পানিবন্দী গ্রাম থেকে অনেকটা সাঁতার কাটার মতো করে আসা-যাওয়া করছিলেন। প্রায় ২০০ গজ দীর্ঘ পথ বুকসমান পানি ঠেলে তীরে ওঠেন তিনি।

করোনাকালে সিলেটের নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়েছে পাহাড়ি ঢলে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় উঁচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। নিচু এলাকায় পানি থাকায় কষ্ট সয়ে চলছেন মানুষ।

বুরহান সালুটিকর বাজারের একজন খুদে ব্যবসায়ী। বাড়ি মিত্রিমহল গ্রামে। তাঁর ওই গ্রামসহ আশপাশের রানীগঞ্জ, দামারীপার, চৌধুরীকান্দি, দ্বারিরপার, দ্বারিকান্দি, কমদমতলা, মিত্রিমহল, মানাউরা গ্রামের মানুষ পানিবন্দী। এই গ্রামের যেসব বাসিন্দার নৌকা নেই, তাঁরা এ রকম বিড়ম্বনায় আছেন।

সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার মিলনস্থলে অবস্থান সালুটিকরের। এখানাকার যাতায়াত ব্যবস্থাও নাও-নদীময়। চেঙ্গেরখাল থেকে গোয়াইন নদের সংযোগে হাওর-বিল। বর্ষায় জলমগ্ন এলাকা নৌকা দিয়ে সহজে পাড়ি দেওয়া যায় নৌপথে। যেন এক হাটে গিয়ে তিন উপজেলায় পদচারণ।

শনিবার ছিল ‘নাওবাজার’। প্রতিবছরই বৈশাখ মাসের পর থেকে নৌকার হাট বসে। গোয়াইনঘাটের বৈটাখাল, নিয়াইন, লেঙ্গুড়া এলাকার বিক্রেতারা বেশি নৌকা নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। তিন উপজেলা ছাড়াও হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার মানুষ এখান থেকে নৌকা কিনে নিয়ে যান। আশ্বিন মাস পর্যন্ত চলে এই নাওবাজার।

এবার হাটে ক্রেতা কম বলে জানালেন ইজারাদার সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, যে বছর আগাম বন্যা হয় না, হাওরের ফসল স্বস্তিতে ঘরে তোলা সম্ভব হয়, সে বছরই বেশি জমজমাট হয় নাওবাজার। হাটের শুরুতেই ৮০-৯০টি নৌকা কেনাবেচা হতো। এবার দুই-তিন হাট হিসাব করে এই পরিমাণ নৌকা বিকোচ্ছে না। সিরাজুল বলেন, ‘রোগ-শোকে শতবর্ষী হাটের এই দশা ই-বারকুই পয়লা দেখরাম। মানুষ লকডাউনের মইধ্যেই আছে।’

>

সিলেট অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামে গত ২৭ জুন। নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত হয় ওই রাত থেকে
গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছিল

নাওবাজার থেকে দেখা গেল সালুটিকর আশপাশের রানীগঞ্জ, দামারীপার, চৌধুরীকান্দি, দ্বারিরপার, দ্বারিকান্দি, কুচয়ারপার, কমদমতলা, মিত্রিমহল, মানাউরা, নন্দিরগাঁও গ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। মানুষ আসা-যাওয়া করছেন নৌকায় করে। আর নৌকা না পেলে জরুরি প্রয়োজনে পানি ঠেলে বুরহানের মতোই যাতায়াত চলছে।

১০টি গ্রাম পানিতে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে বলে জানালেন নন্দিরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমার ইউনিয়নটা গোয়াইনঘাট উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে নিচু ও ভাটি এলাকা। তাই বন্যার পানি থাকে প্রায় চার মাস। আশ্বিন মাস পর্যন্ত পানি থাকবে। এই সময়ের মধ্যে মানুষের পানিবন্দী অবস্থায় থাকা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’

সিলেট অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামে গত ২৭ জুন। সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাটের ডাউকি ও পিয়াইন নদ দিয়ে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত হয় ওই দিন রাত থেকে। জাফলং, আলীরগাঁও, পশ্চিম জাফলং, রুস্তমপুর, ডৌবাড়ী, লেঙ্গুড়া, তোয়াকুল হয়ে পানি স্থায়ী রূপ নিয়েছে এখন নন্দীরগাঁও ইউনিয়নে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ২৯ জুন উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯টি ইউপির ১৫০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় চার হাজার হেক্টর জমির বীজতলা ও আউশ ফসলের ক্ষতি হয়। এতে মোট ৬৫ হাজার কৃষিসংশ্লিষ্ট মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন উল্লেখ করে বলা হয়, পানি কমলেও এখনো পানিবন্দী আছে ৯০০টি পরিবার।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুস সাকিব প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ির ক্ষতির সঙ্গে কৃষি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় থাকা লোকজনের বেশির ভাগের পেশা কৃষি। মোট চার হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুনর্বাসনে পদক্ষেপ কৃষিক্ষেত্রে নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান। সালুটিকর এলাকা সম্পর্কে ইউএনও বলেন, ‘আমি ওই সব এলাকা একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। পানিবন্দী মানুষ যাতে কোনো রকম সমস্যার মধ্যে না পড়েন, ওই সব এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন