খুলনা থেকে আসা ১৪ ট্রাক গম নিম্নমানের দাবি করে তা কুষ্টিয়ার কুমারখালী সরকারি খাদ্যগুদামে ঢোকাতে বাধা দিয়েছেন সরকার দলীয় স্থানীয় সাংসদ আবদুর রউফ।

গতকাল শনিবার সকাল নয়টার দিকে এ ঘটনার সময় পাশের বাজারের কয়েক শ লোক খাদ্যগুদাম চত্বরে জড়ো হন। নিম্নমানের গম নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলে গুদামের কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।

default-image

কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ আবদুর রউফ গুদাম চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘খুলনা থেকে ট্রাকে করে গম এসেছে। সব গম আটকে দিয়েছি। ফেরত দিতে বলেছি। এখানে নামানো হবে না। সব গমের নমুনা সংগ্রহ করেছি। ঢাকায় সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করানো হবে। পরীক্ষার ফল সায়েন্স ল্যাবরেটরির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত লিখিত প্রতিবেদনসহ সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করব। আমার দেখার দৃষ্টিতে মনে করছি, এটা ভালো গম নয়। এই গম ফেরত যাবে। একটাও ঢুকবে না।’
এটা ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম কি না—জানতে চাইলে সাংসদ বলেন, ‘সেটার (ব্রাজিলের) অংশ কি না, জানি না। তবে এটা নিম্নমানের গম। অন্ততপক্ষে কুমারখালী গুদামে এটা (গমের নমুনা দেখিয়ে) ঢুকতে দেব না।’ এর কিছু সময় পর সাংসদ চলে যান।
বেলা দুইটার দিকে কুমারখালী খাদ্যগুদামে গিয়ে দেখা যায়, গুদামের ভেতরে গমবোঝাই নয়টি ও বাইরে পাঁচটি ট্রাক দাঁড়ানো। এসব ট্রাকের চালক ও চালকের সহকারীরা গুদামের ভেতরে বসে ছিলেন। সুলতান আহমেদ ও মাহফুজ আহমেদ নামের দুজন চালক জানান, গত শুক্রবার রাতে খুলনার বৈকালী গুদাম থেকে ১৪টি ট্রাকে গম বোঝাই করে ভোরে কুমারখালী গুদামে পৌঁছান। গুদামে গম দিয়ে ফেরত যাওয়ার কথা ছিল।
দুপুরে কুমারখালী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে কুষ্টিয়া শহরের খাদ্য ব্যবসায়ী আলামিন রেজা এডিসনকে দেখা যায়। ওই ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, ট্রাকের গমগুলো বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে আনা হয়েছে। যেগুলো আগে থেকে কিনে নেওয়া ছিল। সে জন্য ট্রাকের গম শহরে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে কুমারখালী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাবুল আলম জানিয়েছিলেন, এসব গম পুনরায় খুলনা ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ী এডিসনের ওই কথার পর খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা শাহাবুল জানান, গমগুলো ৩০ জুনের আগের বিভিন্ন বরাদ্দের বিপরীতে বিক্রি হয়ে গেছে। কতটি প্রকল্প এবং প্রকল্পের প্রধানেরা কতজন এসেছেন—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এদিকে বেলা আড়াইটার দিকেই দুটি ট্রাক কুষ্টিয়া শহরের বড়বাজারের রাজারহাটে দুটি আটার মিলে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। ওই দুটি ট্রাকের চালকদের কাছে এডিসনের স্বাক্ষরিত কাগজ দেখা গেছে। পরে বিভিন্ন সময় অন্য ট্রাকগুলোও শহরে ঢুকে যায়।

কুমারখালী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাবুল আলম বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রায় ২৩৪ টন গম খুলনা থেকে কুমারখালীতে ১৪টি ট্রাকে করে আনা হয়েছে। সকালে সাংসদ গুদামে ঢুকতে নিষেধ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম খুলনা থেকে ১৪টি ট্রাকে করে কুমারখালীতে আনা হয়।’ এই গমগুলো টেস্ট রিলিফ ও কাজের বিনিময়ে খাদ্যসহ (কাবিখা) বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে আনা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম যে নিম্নমানের, সে বিষয়টি পরীক্ষিত। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় নিম্নমানের এ ফল পাওয়া গেছে। ওই সংস্থার পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমদানি করা এই গমে কুঁচকানো ও ভাঙা দানার পরিমাণ সরকারনির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। আর ভাঙা দানার পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। দেশের ১৪টি খাদ্যগুদামের গমের নমুনা পরীক্ষা করে এ ফলাফল পেয়েছে সরকারি সংস্থাটি। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত রোববার পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ করা গমের আটা অত্যন্ত নিম্নমানের। পুলিশের সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর এসব নিম্নমানের গম ও আটা খাচ্ছেন। এতে তাঁদের মনোবল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে সাংসদের গতকালের পদক্ষেপের বিষয়ে কুমারখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমপিরাই সংসদে আইন পাস করেছে। সরকার গম কিনেছে। কিনলে তো পচা গম সরকারই কিনেছে।’ তাঁর প্রশ্ন, সাংসদ কি সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে সরকারের বিপরীতে দাঁড়াতে চান?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0