এই নেতাদের দিয়ে বরগুনায় বিএনপির রাজনীতি সচল করা যাবে না। তাঁরা দিনে বিএনপি আর রাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করেন। তাঁরা নেতৃত্ব আগলে রেখে দলীয় স্বার্থ নয়, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন।’ বরগুনা জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে এসব কথাই বললেন দলের কয়েকজন তরুণ নেতা।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এখানে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে তরুণ নেতাদের আস্থার সংকট দিন দিন বাড়ছে। জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা দলীয় কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত। গত বছর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় অবস্থিত দলীয় কার্যালয়টিও বন্ধ থাকে বেশির ভাগ সময়।
দলের তরুণ নেতাদের একজন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হাবিবুর রহমান (পান্না)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বরগুনায় বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন ও বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী আছেন। কিন্তু যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব আগলে রেখেছেন, তাঁদের অনেকেই দিনে বিএনপি করেন আর রাতে আওয়ামী লীগের হয়ে যান। এই নেতাদের দিয়ে বরগুনার বিএনপিকে আর সক্রিয় করা সম্ভব না।’ তাঁর মতে ‘ত্যাগী’ ও ‘জনপ্রিয়’ নেতাদের নেতৃত্বে আনতে হবে।
অবশ্য অভিযোগ মানতে রাজি নন প্রবীণ নেতা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ একদম ঠিক নয়। এখানে যাঁরা রাজনীতি করেন সবার সঙ্গে সবার আত্মীয়তা বা সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। এটাকে আঁতাত বলা যাবে না।
জেলা সভাপতি অভিযোগ করেন, তরুণ নেতারা বিশেষ করে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা দলীয় ‘চেইন অব কমান্ড’ মানেন না।
বরগুনা জেলা বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১০ সালে। এতে আগের কমিটির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক এস এম নজরুল ইসলাম পুনরায় একই পদে নির্বাচিত হন। এঁরা মাঝে এক মেয়াদ বাদে ১৯৯৩ সাল থেকে জেলা বিএনপির দুই শীর্ষ পদে আছেন।
তরুণ নেতাদের দাবি, জ্যেষ্ঠ নেতাদের কারণে এখানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। অতীতে গ্রহণযোগ্য যেসব নেতা ভোটের রাজনীতিতে এগিয়ে গেছেন, তাঁদের নানাভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়। ফলে এখানে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেনি।
২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বরগুনা সদর উপজেলায় প্রার্থী হন জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম মোল্লা। তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ দলীয় নেতাদের অসহযোগিতার কারণেই তিনি জিততে পারেননি। ওই নির্বাচনে বিজয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল খালেক। তিনি পরে বিএনপিতে যোগ দিলেও ভালো পদ পাননি।
২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজবুল কবিরকে দলীয়-সমর্থন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন সদর উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি আবদুল হালিম। দুজনের কেউই জিততে পারেননি।
আবদুল হালিমের দাবি, মাঠপর্যায়ে তাঁর অবস্থান ভালো হওয়ায় মনোনয়ন প্রশ্নে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের দলীয় নেতাদের গোপন ভোট নেওয়া হয়েছিল। এতে তিনি সর্বাধিক ভোট পেলেও জেলা বিএনপির কতিপয় জ্যেষ্ঠ নেতা তা উপেক্ষা করে রেজবুল কবিরকে সমর্থন দেন। এতে তৃণমূল নেতারা হতাশ হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
একই অবস্থা বিরাজ করছে উপজেলা পর্যায়েও। আমতলী উপজেলা বিএনপির কমিটি নিয়ে জেলা নেতাদের সঙ্গে বরগুনা-২ আসনের সাবেক সাংসদ মতিয়ার রহমান তালুকদারের বিরোধের কারণে সেখানে দলের কোনো কার্যক্রম নেই। পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপির কার্যক্রমও তেমন জোরদার নয়। বামনা, বেতাগী ও তালতলি উপজেলায় কমিটি থাকলেও সেখানকার নেতারা নিষ্ক্রিয়।
মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনগুলোতেও স্থবিরতা বিরাজ করছে। জেলা ছাত্রদলের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০০২ সালে। ওই কমিটির সভাপতি রেজবুল কবির এখন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। ছাত্রদলের ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিকুজ্জামান মাহফুজ এখন সংগঠনের আহ্বায়ক। একই সঙ্গে তিনি সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। ২০১০ সালে তিন মাসের জন্য ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছিল, কিন্তু পাঁচ বছরেও তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি।
আহ্বায়ক শফিকুজ্জামান মাহফুজ দাবি করেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার ব্যাপারে আমরা বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা করা যায়নি।’
এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন (জাসাস), মুক্তিযোদ্ধা দল, জেলা কৃষক দল ও তাঁতী দলের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
দলীয় কার্যক্রমের এই ‘নিষ্ক্রিয়তা’ বিষয়ে জেলা কৃষক দলের সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আবদুল খালেক বলেন, ‘দলকে সংগঠিত করার ব্যাপারে নেতাদের উদ্যোগ আর আগ্রহ দরকার। বরগুনায় সেটা অনুপস্থিত। ফলে নেতা ও কর্মীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।’
দলে এই স্থবিরতার কথা স্বীকার করেন বরগুনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এস এম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরে কিছু সমস্যার কারণে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। মামলার ভারে নেতা-কর্মীরা জর্জরিত। তারপরও আমরা জ্যেষ্ঠ ও তরুণদের সমন্বয়ে দলকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0