default-image

করোনার বিপদের মধ্যেই বন্যা আসছে। এ যাত্রায় মাঝারি মাপের একটা বন্যা হবে। মাঝারি মাপের কোনো সংজ্ঞা তাঁদের নেই। অভিজ্ঞতা বলে মাঝারি বললে ধরে নিতে হবে, নদী অববাহিকার সব নিচু এলাকা (পাট আর আমন খেত), ‘কায়েমি’ চর, ভাসা চর সব তলিয়ে যাবে। ভাদ্র মাসের আগে তা আর জাগবে না। এসব অঞ্চলে প্রায় এক কোটি প্রান্তিক মানুষের বসবাস।

কথিত মাঝারি বন্যার প্রথম চাপেই প্লাবিত হয়েছে দেশের উত্তর আর মধ্যাঞ্চলের ১৩ জেলা। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও দিনাজপুরের নিচু এলাকা আর গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুরের বেশির ভাগ এলাকা প্লাবনের ঝুঁকিতে আছে অথবা ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। গত দুই দিনে পানি একটু টান ধরলেও কমার গতি বেশ শ্লথ। এর মধ্যে ভারী থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির আশঙ্কা জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। সীমান্তের ওপারেও একই ধরনের পূর্বাভাস আছে। আসামের ওপর ও নিচের দিকে আরও বন্যা আর বৃষ্টির জন্য মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, জামালপুর আর টাঙ্গাইলের নানা জায়গার মানুষ ঘর ছেড়ে উঁচু জায়গায় বিদ্যালয়ে জায়গা নিয়েছে। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেক দিন থেকে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় আশ্রয় গ্রহণকারীরা বিশেষ সংকটে পড়েছে।

গাইবান্ধার মোল্লারচর উচ্চবিদ্যালয়ে পানির কল, পায়খানা ইত্যাদি ব্যবহার উপযোগী নেই বলে জানিয়েছেন আশ্রয় গ্রহণকারীরা। গাইবান্ধার সাঘাটা, ফুলছড়ির বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের একই অবস্থা। এই বাঁধ মেরামতের সময় এখানকার প্রায় ২০ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তারাই আবার ফিরে এসেছে বাঁধে। আগে যখন এই বাঁধে মানুষের বসতি ছিল, তখন মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে পানির কল ও পায়খানার ব্যবস্থা করে নিয়েছিল। ফলে বন্যার সময় চরের মানুষ বাঁধে আশ্রয় নিতে এলে পানীয় জল আর ল্যাট্রিনের সমস্যায় পড়েনি। এবার তাদের সমস্যা দ্বিগুণ হয়েছে।

উত্তরের জনপদ রৌমারীর বন্যা সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গরুর চর্মরোগ বা এলএসডি। এটা সেই অঞ্চলে প্রায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। উজানের জনপদে এই রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এবারের বন্যা আমাদের গো-সম্পদের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

আমরা এখন কী করতে পারি

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী তাঁর টুইটার বার্তায় খুবই আবেগঘন বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘হাত বাড়ালেই পাবেন আমাদের। যখন যেখানে যেটা প্রয়োজন, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তেই দ্রুত এবং সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বন্যাদুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছি। সাহস হারাবেন না। বন্যাকবলিত জেলাগুলোর অভিমুখে আমাদের উপহার নিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটছে ত্রাণবাহী ট্রাক।’ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি নিজেও বন্যাকবলিত জেলার প্রশাসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছেন।

মন্ত্রীর পাঠানো ত্রাণবাহী ট্রাকে যা-ই থাকুক না কেন, বন্যা উপদ্রুত আর আশ্রয় নেওয়া মানুষের এখন দরকার নিরাপদ পানীয় জল, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, প্রত্যেকের জন্য একটা গামছা, খাদ্য, আর প্রাণিস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সবার আগে দরকার সমন্বয়। সমন্বয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, সমন্বয় প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, সমন্বয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আর স্বাস্থ্য তো আছেই। এবার কিন্তু প্রতিটি উপজেলার সমস্যা ও প্রেক্ষাপট আলাদা। কাজেই উপজেলাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা ভাবতে হবে। ওই যে টুইটারে মন্ত্রী লিখেছেন তাৎক্ষণিক আর দ্রুত সিদ্ধান্তের কথা, সেটা যেকোনো সংকট ব্যবস্থাপনার মূল কথা।

ওপরের আলোচনায় যে কয়টা সমস্যা আর সংকটের ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে, তার কোনোটিই বন্যা সঙ্গে করে আনেনি। আগে থেকেই ছিল। আমরা জানতাম বন্যা আসবে। বদ্বীপে বন্যা কোনো কাকতালীয় বিষয় কিংবা অঘটন নয়। গরুর এলএসডি যে উত্তরবঙ্গের কোনা ঘাপচি ছাড়ছে না, রৌমারীর কৃষকেরা যে পেরেশানির মধ্যে আছেন, সেটা নিয়ে ভূরি ভূরি খবর, সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। বন্যা এলে এই সংকট সারা দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেটা বোঝার মতো আক্কেল আমাদের নিশ্চয় আছে। ব্রহ্মপুত্রের বাঁধ মেরামতের সময় কি আমরা জানতাম না বন্যার সময় বানভাসি মানুষ এখানেই আশ্রয় নেবে। তাহলে বাঁধের ওপর পরিকল্পিতভাবে পানির কল আর পায়খানার ব্যবস্থা আমরা রাখিনি কেন? যাঁরা বাঁধ বানানো শেখান, তাঁরা কি কোনো সময় বন্যা দেখেননি। বাঁধের নানাবিধ ব্যবহার কি তাঁরা কখনো দেখেননি? এখন মানুষ তার প্রয়োজনে বাঁধে কল বসাবে, পায়খানা বানাবে, তাতে বাঁধের ক্ষতি হবে বৈকি, কিন্তু উপায় কী?

স্কুল কর্তৃপক্ষও জানত বন্যার সময় ফি বছর মানুষ সেখানে আশ্রয় নেয়। তারা ভাবতে পারত করোনার বছরে যখন স্কুল বন্ধ, তখন সেই ফুরসতে স্কুল বাড়িগুলো মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে রাখি। এমন কিছু ব্যবস্থা করি, যাতে স্কুল খুললে ছেলেমেয়েদের হাত ধোয়ার জন্য লাইন দিতে হবে না। তাহলেই কিন্তু বন্যা উপদ্রুত মানুষের একটা ব্যবস্থা হয়ে যেত। বন্যার সঙ্গে আমাদের বসবাস, তাই বন্যার প্রস্তুতি সারা বছরের কাজ। বন্যার খবর এলে রাজধানী থেকে জেলাগুলোর দিকে বন্যা উপহার নিয়ে দ্রুতগতিতে ত্রাণবাহী ট্রাক ছুটিয়ে দিলে তার একটা ক্যামেরা ভ্যালু তৈরি হবে। কিন্তু সাঘাটার বাঁধে আশ্রয় নেওয়া কিশোর-কিশোরীর কোনো লাভ হবে না। তাদের অন্ধকার না নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে পায়খানার বিকল্প খোঁজার জন্য।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0