এলাকায় বিষধর সাপ ও গুইসাপের অত্যাচার বাড়াবাড়ি রকমের। গণি মিয়া আজব এক পদ্ধতি বের করেছিলেন। হাঁস-মুরগির ডিমের গায়ে সুই দিয়ে তিনি সুনিপুণ কৌশলে ছিদ্র করে, সেই ছিদ্র উপুড় করে ডিমের ভেতরের কুসুমসহ তরল ফেলে দিয়ে ভেতরে কৌশলে পুরে দেয় পান খাওয়া পাথুরে চুন। তারপর পুকুরঘাট, বাগান ও অন্যান্য সম্ভাব্য স্থানে ডিম ফেলে রাখেন। সাপ, গুইসাপেরা ডিম খায় গিলে। বেজি, বনবিড়াল, শিয়াল, খাটাশরা ডিম চিবিয়ে ভেঙে খায়। এই ‘ডিমটোপ’ গিলে গোখরা, দাঁড়াশ সাপসহ গুইসাপের দারুণ-করুণ ও মর্মান্তিক যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুদৃশ্য খোকনও দেখেছে। পেটে চুন গেলে সাপ-গুইসাপেরা যে কী পরিমাণ তড়পায়, সেই করুণ মৃত্যুদৃশ্য দেখে খোকনের মা কেঁদে ফেলেছেন কয়েকবার।

এ রকম নিষ্ঠুর-নির্মম কাজ করতে নিষেধও করেছিলেন গণি মিয়াকে। কিন্তু গত রাতে তিনটি হাঁসের ডিমের ফাঁদ পেতেছিলেন পুকুরঘাটের পাশে। এইমাত্র তড়পাতে তড়পাতে মরা সরু ঠোঁটের পাখিটিকে চেনে সবাই। কিন্তু এরা যে ডিমের ফুটো দিয়ে ঠোঁট ঢুকিয়ে লম্বা জিবটা দিয়ে ডিমের কুসুম পান করতে চাইবে, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য-অভাবিত। সবার চেনাজানা কাদাখোঁচা পাখি এটি। পুকুর, দিঘি, বিল, ধানখেতে নামে,Ñ দেখা যায় না সহজে, শরীরের রং এদের ঘাস, মাটি, জল তথা পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে মিলেমিশে ক্যামোফ্লেজ হয়ে যায়। কোনো মানুষ খুব কাছে গেলেই এমন শব্দে ফুড়ুত করে উড়াল দেয় যে মানুষ চমকে ওঠে, ভয়ও পেতে পারে। নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে আবারও নেমে পড়ে মাটিতে। ভেজা ভেজা কাদামাটিতে লম্বা ঠোঁটটি ঘন ঘন ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে খায় জলজ পোকামাকড়, লার্ভা, কেঁচো ও কেঁচোজাতীয় প্রাণীসহ অন্যান্য ছোট ছোট জ্যান্ত প্রাণী। ক্বচিৎ ঘাসফড়িং ও অতি ছোট মাছ।

বর্ণিত নির্মম-নিষ্ঠুর ঘটনাটি আমি দেখেছিলাম ক্লাস ফোরে পড়ার সময় (১৯৬২ সাল), বাগেরহাটের ফকিরহাটে। এই ২০২২ সালেও ভুলিনি আমি সেই দৃশ্যটির কথা। চুন পেটে পড়া বেজি, গুইসাপ, সাপ ও বনবিড়ালের মৃতদেহও দেখেছিলাম। তখন সব ধরনের বন্য প্রাণী ছিল দেদার, জনসংখ্যা ছিল কম। গ্রামবাংলার কিছু কিছু মানুষ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ডিম-চুনের টোপ ব্যবহার করতেন।

কাদাখোঁচার ইংরেজি নাম কমন স্নাইপ। বৈজ্ঞানিক নাম Gallinago gallinago। বাগেরহাটে এটি কাদাখোঁচার চেয়ে কাদাচ্যাগা ও মেটেচ্যাগা হিসেবে বেশি পরিচিত। দৈর্ঘ্য ২৬ সেন্টিমিটার। ওজন ৮৫ গ্রাম। একনজরে ছদ্মবেশী, বাদামি শরীর, পেট সাদা। সারা শরীরে ছিট-ছোপ ও টান। লম্বা হলদে-বাদামি ঠোঁটটির আগা কালচে। হলদে-বাদামি পা। লেজের আগার চমৎকার পালকগুলো এরা জাপানি হাতপাখার মতো মেলে দিতে পারে।

পালকের উপরিভাগের রং চমৎকার মনকাড়া। গাঢ় খয়েরি লাল রঙে সূর্যালোকের চমৎকার ঝলক দেখা যায় দু-এক পলকের জন্য। মনে হয় ‘রংধনুরঙা’ ডিসপ্লে। আরও অবাক সৌন্দর্য আছে এদের। রাতে মাটিতে বসে ঘুমানোর সময় লম্বা ঠোঁটটিকে এরা পিলারের মতো ব্যবহার করে, বলা যায় ঠোঁটের ওপরে মুখ-মাথা ভর দিয়ে চমৎকার ভঙ্গিতে ঘুমায়।

শরীফ খান, পাখি বন্য প্রাণিবিষয়ক লেখক

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন