default-image

বছরের প্রথম থেকেই অস্থির আচরণ শুরু করেছে আবহাওয়া। গত বছরও বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষণে ক্ষণে আবহাওয়ার রূপবদল দেখেছে। মুখোমুখি হয়েছে ঘন ঘন নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি আর বন্যার। এ বছরও বাংলাদেশকে এসবের জন্য তৈরি থাকতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অন্তত তা-ই বলছে।

এর কারণ বঙ্গোপসাগরের ওপর উষ্ণ বায়ু সক্রিয় আছে। আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত উষ্ণ বায়ুর এই সক্রিয়তা চলমান থাকবে। ফলে বছরজুড়ে এর নানা প্রভাবের মধ্যে থাকতে হবে বাংলাদেশকে। শীত, গরম, রোদ-বৃষ্টি, নিম্নচাপ-ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ছাড়িয়ে এটা কৃষি, মৎস্যসহ সার্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে। পাল্টে দেবে আমদানি-রপ্তানির হিসাব। ছায়া ফেলতে পারে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস আর আবহাওয়াসংক্রান্ত একাধিক গবেষণায় জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

আবহাওয়া ও জলবায়ুসংক্রান্ত বিশ্লেষণ বলছে, দেশে গত এক যুগে প্রকৃতির অস্বাভাবিক আচরণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তির দিকে। যেমন বৃষ্টি, বন্যা, ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের কারণে দেশের উপকূল থেকে উত্তরাঞ্চল—সব এলাকার মানুষ গত তিন বছর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভুগেছে।

বিজ্ঞাপন

বছরের শুরুতে লা নিনার প্রভাব

প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়ার একটি বিশেষ অবস্থাকে লা নিনা বলে। সাধারণত প্রতি ছয় থেকে আট বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় একটি সমান্তরাল রেখা বরাবর পানি অস্বাভাবিক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর দিয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়। এর প্রভাবে ওই সাগরগুলো থেকে প্রচুর মেঘ তৈরি হয়। ফলে সাগরগুলোর তীরবর্তী এলাকার দেশগুলোতে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়। শীতকালে মেঘের কারণে শীতল বায়ুর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে শীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণতা থাকে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছর শীতল মাস ডিসেম্বর ও জানুয়ারিজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা ছিল। শহরে ছিল ২ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারতসহ প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলো ইতিমধ্যে লা নিনা সতর্কতা জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত লা নিনা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লা নিনা সক্রিয় থাকবে। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে বাড়তি উষ্ণতা আর বৃষ্টি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখতে হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) একই পূর্বাভাস দিয়ে বলছে, এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত উষ্ণতা বেশি থাকবে, যার প্রভাব জনজীবন থেকে ‍শুরু করে কৃষির ওপর পড়বে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বছরব্যাপী করোনার ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে বিশ্বে তাপমাত্রার বৃদ্ধি যে পরিমাণে কমবে বলে আশা করা হয়েছিল, ততটা বাস্তবে ঘটেনি। পাশাপাশি গত নভেম্বর থেকে লা নিনা সক্রিয় হয়ে ওঠায় সাগর থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু এবং মেঘ বাংলাদেশের দিকে বেশি যাচ্ছে। ফলে দেশে এবার বৃষ্টি বেশি হবে, আগাম বন্যার আশঙ্কাও আছে।

ভেজা ভেজা শীতকাল

মাঘ মাসের অর্ধেক চলে গেছে। আর কদিন পরেই ফাগুনের বাতাসে ভর করে আসবে বসন্ত। কিন্তু তার আগে জানুয়ারি মাসে তো জেঁকে শীত পড়ার কথা। এবার তা হলো না। এর কারণ সেই লা নিনার প্রভাব। বঙ্গোপসাগর উষ্ণ করে রাখছে লা নিনা। সাগর থেকে গরম বাতাস এসে আকাশ মেঘলা করে দিচ্ছে। শীতও কমিয়ে দিচ্ছে। বাতাস টানটানের বদলে ভেজা ভেজা হয়ে আছে। ইতিমধ্যে কোথাও কোথাও হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও হয়ে গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, এবার নভেম্বর থেকে শীত জেঁকে বসার সময়েই আকাশে মেঘের ঘনঘটা বেড়ে যায়। ফলে দেশের কোথাও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হয়নি। এমনকি কোনো শৈত্যপ্রবাহ এক সপ্তাহও স্থায়ী হয়নি। মূলত লা নিনার কারণে এমন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নিম্নচাপ বেশি হবে

ভারতের আবহাওয়া বিভাগের হিসাবে, ২০২০ সালটি ছিল বঙ্গোপসাগরের ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণ সময়কাল। গ্রীষ্মকালে এই সাগর এলাকায় স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। গত বছরের মে মাস থেকে সেখানকার তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠানামা করেছে। ফলে ঘূর্ণিঝড় আম্পান, গতি, নিসর্গ ও নিভার নামে চারটি বড় ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে আম্পান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, নিসর্গ ভারতের গুজরাট, গতি আর নিভার ভারতের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত করেছে।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (আইএমডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে এবার লঘু ও নিম্নচাপ বেশি তৈরি হবে। কিন্তু সেগুলো খুব বেশি শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা কম। ফলে তিন বছর ধরে সেখানে যেভাবে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে, তা এবার এত প্রকট আকার নিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আঘাত না–ও করতে পারে।

এ ব্যাপারে ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে এবার লঘু ও নিম্নচাপ বেশি হতে পারে। এতে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। তবে এ পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে, তাতে মনে করা হচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে নিম্নচাপের পরিমাণ বাড়তে পারে।

আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস নিয়ে গবেষণা করেন এমন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার লা নিনার কারণে মার্চ-এপ্রিলের দিকে বৃষ্টি বেশি হতে পারে। ফলে আগাম বন্যার আশঙ্কা এবার বেশি। ২০১৭ সালে এ ধরনের আগাম বন্যার মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। ফলে হাওরে ফসলহানি হয়েছিল।

default-image

কালবৈশাখী আর বজ্রপাতের বিপদ বেশি

মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে কালবৈশাখী আর বজ্রপাত বেশি হয়। এবার তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা। কারণ সেই লা নিনা। পুঞ্জীভূত তাপের কারণে সাগরে লঘুচাপ ও নিম্নচাপ বেশি তৈরি হবে। ফলে এবার ওই তিন মাসজুড়ে বজ্রপাত বেশি হতে পারে।

গত বছরও বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বজ্রপাত ২০ শতাংশ বেশি হয়েছিল বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের বছরগুলোর তুলনায় গত বছর বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর হারও ১০ শতাংশ ছিল বেশি।

আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন, জানুয়ারি থেকে এবার বঙ্গোপসাগর এবং মূল ভূখণ্ডে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে। এতে মার্চ-এপ্রিলে বজ্রপাত বেশি হতে পারে।

বন্যার আশঙ্কা বেশি

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়ের আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে একটি গবেষণা করে ২০১৮ সালে। তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে এখন বর্ষার শুরু আর শেষ ভাগে বৃষ্টিপাত বেশি হচ্ছে।

গত বছরের বর্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টি বেশি হয়েছে। বর্ষার শুরুতে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়, আর পুরো বর্ষায় বৃষ্টি বেশি হয়েছে ১১ শতাংশ। ফলে গত বছর বর্ষার শুরুতে ফসলের এক দফা ক্ষতি হয়।

গত বছর বন্যা হয়েছিল পাঁচ দফায়। বন্যা দীর্ঘায়িত হয়েছিল ৪১ দিন। দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম ওই বন্যায় আমন ধানে উৎপাদন কমে যায় ১৫ লাখ টন। এতে দেশে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে সরকারকে তিন বছর পর চাল আমদানি করতে হচ্ছে।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তার লা নিনা পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১২ ও ২০১৭ সাল ছিল লা নিনা বছর। ওই বছরগুলোতে অতিবৃষ্টিতে বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। ফলে চাল ও গমের উৎপাদন কমে যায়, দাম বেড়ে যায়। এ বছরও একই পরিস্থিতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে করণীয় কী? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, লা নিনা ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে বন্যা বাড়ছে। ফলে বন্যা আসার আগে এপ্রিলের মধ্যে পাকবে এমন ধানের জাত উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম এমন ফসলের জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টিসহ অন্যান্য দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। সবার আগে জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম যাতে টানা যায়, অর্থাৎ বিশ্বের তাপমাত্রা যেন এই শতাব্দীতে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, সে জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে বিশ্বের সব দেশের মতো বাংলাদেশকেও ভূমিকা রাখতে হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবারও কৃষি, উন্নয়নকাজসহ সব পরিকল্পনায় আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয়টি মাথায় রেখে এগোতে হবে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন