বিজ্ঞাপন

সবকিছু বিবেচনা করে ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের খসড়া প্রস্তাবে এ বছর সিদ্ধান্ত না নেওয়ার সুপারিশ করে বলেছে, আগামী সম্মেলনের আগে বাংলাদেশকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। উল্লেখ্য, আগামী সম্মেলন হবে ২০২২ সালের জুলাইয়ে। বাংলাদেশকে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে আগামী বছর ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

ইউনেসকোর সঙ্গে সুন্দরবন বিষয়ে বাংলাদেশের যে দলটি কাজ করছে, তার অন্যতম সদস্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ইউনেসকোর সব শর্ত পূরণ করছি। উল্টো শর্তের বাইরেও সুন্দরবন রক্ষায় অনেকগুলো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি, আমাদের গর্ব এই বন নিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত হবে না।’

ইউনেসকো ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। তবে বনের আশপাশে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে সুন্দরবনের ওই তালিকায় থাকা ঝুঁকিতে ফেলেছে।

সরকারের প্রতিবেদন

ইউনেসকোর শর্তের মধ্যে ছিল, বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের কাছে নির্মাণাধীন রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ রাখতে হবে। বনের পাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া যাবে না। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্য যেসব শিল্পকারখানার কাজ চলছে, সেগুলো সুন্দরবনের ওপরে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে বা ফেলবে, তা সমীক্ষা করতে দেখতে হবে। পাশাপাশি দেশের পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা (এসইএ) করতে হবে। পটুয়াখালীর পায়রা ও বরগুনার তালতলীতে নির্মাণাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা–ও যাচাই করে দেখার শর্ত দেওয়া হয়েছিল ইউনেসকোর পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশ ইউনেসকোর কমিটিকে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনের পাশে নতুন করে কোনো ধরনের বড় শিল্পকারখানার অনুমোদন দেয়নি। পরিকল্পনায় থাকা একটি বেসরকারি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রামপাল প্রকল্পে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের বাতাস, পানি ও মাটির কোনো ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

বাংলাদেশ সরকার আরও বলেছে, এসইএ করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসকে (সিইজিআইএস)। তারা চেক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান ইন্টিগ্রা কনসালটিংয়ের সহায়তায় এসইএ করবে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইউনেসকোর শর্তের বাইরেও সুন্দরবন রক্ষায় বাড়তি উদ্যোগ হিসেবে সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিমাণ বাড়িয়েছে। পুরো বনের ৫২ শতাংশ এলাকাকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে।

কী বলছেন পরিবেশবাদীরা

সরকারের দাবির সঙ্গে একমত নন পরিবেশবাদীরা। তাঁরা বলছেন, সরকারের প্রতিবেদনের মধ্যে অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। দেশের ৫০টি পরিবেশবিষয়ক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি ইউনেসকোকে চলতি মাসে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে সুন্দরবনকে রক্ষায় সরকারের উদ্যোগগুলোর ঘাটতি তুলে ধরা হয়। চিঠিতে ইউনেসকোর প্রতি আরেকটি পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর অনুরোধ করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, ইউনেসকোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষার প্রতিটি পর্যায়ের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। এই সমীক্ষাকে দেশের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ গ্রহণ করবে না।

জাতীয় কমিটির চিঠিতে সমীক্ষার দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। বলা হয়, এটি কোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। বরং সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি ২০১০ সালে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করেছিল। সমীক্ষাটি ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। বাংলাদেশের পরিবেশ আইন অনুযায়ী সব পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা সিইজিআইএসের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করার শর্ত থাকলেও তা পূরণ করা হয়নি উল্লেখ করে জাতীয় কমিটির চিঠিতে বলা হয়, এমন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এসইএ করানো বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির শর্তের লঙ্ঘন।

সিইজিআইএস পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান। পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যান হন মন্ত্রণালয়ের সচিব। জাতীয় কমিটির অভিযোগ, সরকার বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত সমীক্ষা এই সংস্থাকে দিয়ে করিয়ে নেয়।

অবশ্য সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক মান ও নিয়ম অনুসরণ করে এসইএ করছি। আর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ তালতলি ও কুয়াকাটা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ করে আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি। সমীক্ষাগুলোতে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন ও ভুল তথ্য নেই।’

ইউনেসকোকে দেওয়া চিঠিতে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হওয়া নাইট্রোজেন অক্সাইড, পারদ, কারসিওজেনিক ডাইঅক্সিন, কয়লার বিষাক্ত ছাইসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী জোয়ার-ভাটা এলাকায় ফেলা হবে, যা ভেসে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে গিয়ে পড়বে। এতে সুন্দরবনের গুরুতর ক্ষতি হবে।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমরা বিশ্বের খ্যাতনামা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে গবেষণা করিয়ে তা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। কিন্তু সরকার আমাদের গবেষণার ফলাফল আমলে নেয়নি। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছেই।’

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন