default-image

আর সপ্তাহ খানেক পর ঈদুল ফিতর। ঈদকে সামনে রেখে পড়েছে নয় দিনের লম্বা ছুটির ফাঁদ। ৩১ মে ও ১ জুন শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। ২ জুন রোববার শবে কদরের ছুটি। ৩ জুন সোমবার অনেকে নিতে পারেন ঐচ্ছিক ছুটি। ৪ জুন মঙ্গলবার (২৯ রমজান) থেকে ৬ জুন বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতরের তিন দিনের ছুটি পড়ছে।

এরপর আবারও ৭ ও ৮ জুন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। তাই ঈদের আনন্দ আপনজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ঘরমুখী মানুষের বড় অংশ রাজধানী ঢাকা ছাড়বে ৩০ মে। ৩ জুন আরও একটি বড় অংশ ঘরমুখী হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ঈদের সময় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ে। এবার টানা নয় দিনের ছুটি থাকায় এই সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ তো কেবল চিত্র রাজধানী ঢাকায়। তবে সারা দেশেই কর্মজীবী মানুষের বড় অংশ ঈদকে উপলক্ষ করে নিজ ঘরে চলে যাবে। ঘরে ফেরার দিনক্ষণ ৩০ মে, ৩ জুন অথবা অন্য যেদিনই হোক না, ঈদযাত্রায় সঙ্গী হতে পারে বৃষ্টি। ঈদের দিন যত কাছে আসবে, এই বৃষ্টি ভারী রূপ ধারণ করতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এমন পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

তাই ঈদের যাত্রাপথে বৃষ্টি মুখোমুখি হলে ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পরিবহন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস মিলিয়ে বর্ষাকাল। সেই হিসাবে ১ আষাঢ় শুরু হয় জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে। আর শ্রাবণ বিদায় নেয় মধ্য আগস্টে। কিন্তু আমাদের দেশে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের কাছে বর্ষাকালের সময় হিসেবটা দ্বিগুণ। ইংরেজি বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী, তাঁদের কাছে বর্ষাকাল শুরু হয় ১ জুন, শেষ হয় ৩০ সেপ্টেম্বর।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই চার মাসে বাংলাদেশের মোট বৃষ্টিপাতের শতকরা ৭১ ভাগ হয়ে থাকে। বর্ষাকালের এই বৃষ্টি মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বেশি হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল ছুঁয়ে ফেলে সাধারণত ১ জুন। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্ট মৌসুমি বায়ু উত্তর-পূর্ব দিকে গিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে বাধা পায়। বাধা পেয়ে এটি পুবালি বাতাস হয়। এরপর উত্তর দিকে এগিয়ে যায়। যেদিন এই বায়ু বাংলাদেশের ওপর আবির্ভাব হয়, সেদিন থেকেই বর্ষাকাল শুরু হয়।

আবহাওয়াবিদেরা জানান, এবার মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে চলে আসবে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে, না হয় দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের রমজান মাস শুরু তিন দিন আগে ঘূর্ণিঝড় ফণী আঘাত হানে বাংলাদেশে। এর প্রভাবে ৩ ও ৪ মে বৃষ্টি হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু ফণীর প্রভাব কেটে যাওয়ার পর থেকে সারা দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। দাবদাহ বয়ে যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উত্তর–পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলের ওপর দিয়ে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। টানা আট দিনের তীব্র গরমের পর ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টি হয় ১২ মে। এরপর থেকে থেমে বৃষ্টি আর কালবৈশাখী হলেও গরমের বেশ চলতেই থাকে। তবে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, মে মাসের শেষে তিন দিন ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বৃষ্টি আরও বেড়ে যাবে।

আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৌসুমি বায়ু আমাদের দেশে জুনের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহে চলে। অনেক সময় মৌসুমি বায়ু আসার আগে বর্ষার মেঘ দেশের ভেতর আশা শুরু হয়। এখন আবহাওয়া তেমনই রয়েছে। ২৭ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টি হবে। তবে ৩১ মে থেকে ঈদের আগে বৃষ্টির ঘনঘটা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, মে মাসে প্রতিদিন স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত হয় ৩৮৩ দশমিক ৬৭ মিলিমিটার। কিন্তু গত ২৬ মে পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে বৃষ্টি হয়েছে ৩২৩ দশমিক ৭৩ মিলিমিটার। মে মাসের প্রথম ২৬ দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬০ দশমিক ০৬ মিলিমিটার কম বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন, বৃষ্টিপাতের যে ঘাটতি রয়েছে, মে মাসের শেষের দিনগুলোতে সেটি পুষিয়ে যেতে পারে।

মে মাসের শেষ তিন দিন বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতীয় রাজ্যগুলোয় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত তিন দিনে আসাম, মেঘালয়, সিকিম, ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হিমালয় নিকটবর্তী অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

তবে আবহাওয়াবিদরা জানান, ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় বৃষ্টি হলে এর রেশ বাংলাদেশেও পড়ে। বিশেষ করে দেশের উত্তর–পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে বৃষ্টিপাত হতে পারে। বৃষ্টির ধারা ৩ জুন পর্যন্ত থাকতে পারে। ৪ জুন থেকে আবহাওয়া তুলনামূলক শুষ্ক থাকবে। তবে ঈদের দিন কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের আগের দিনগুলোয় নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হতে পারে। ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে ওই সব অঞ্চলের তুলনায় বৃষ্টি কম হবে। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে। আবার কিছুটা রোদও থাকবে। ঈদের আগে ঘরে ফেরার সময় যে ধারায় বৃষ্টির আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তাতে করে আকাশপথ কিংবা রেলপথে চলাচলে সমস্যা হবে না। তবে সড়কপথে যেসব এলাকায় রাস্তার অবস্থা ভালো নয়, সেখানে সমস্যা হতে পারে।

কিন্তু ঈদের আগে বৃষ্টি নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন পরিবহন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্যস্ত সড়কে যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ বেশি থাকবে। তাই কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি হলে বিঘ্ন ঘটতে পারে ঘরমুখী মানুষের চলাচল। তাঁদের মতে, ঈদের সময় যাত্রী চাপ বেশি থাকায় এমনিতেই গাড়ি কম গতিতে চলে। এর সঙ্গে বৃষ্টি যোগ হলে ধীরগতিতে চলবে বাস।

হানিফ পরিবহনের ব্যবস্থাপক মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টি হলে ঈদের সময় ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। টানা বৃষ্টিতে যানজট সৃষ্টি হলে সময়মতো যান বাহন ছাড়তে পারে না। ছাড়লেও নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন