মিরপুরের কাফরুল থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা। দূরত্ব সামান্য হলেও এই দুই এলাকার মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য কমপক্ষে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ এই গ্রীষ্মের দুপুরে কালীগঞ্জে যদি স্বাভাবিক গরম থাকে, তখন মিরপুরের মানুষ মাঝারি মাত্রার দাবদাহে অতিষ্ঠ।

একই ধরনের পার্থক্য রয়েছে মতিঝিলের সঙ্গে সোনারগাঁয়ের আর গাবতলীর সঙ্গে সাভারের।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানকার পাহাড়তলীর সঙ্গে সীতাকুণ্ডের তাপমাত্রার পার্থক্য পাওয়া গেছে প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

পাশাপাশি দুটি এলাকার তাপমাত্রার এই পার্থক্য অবশ্য এক দিনে তৈরি হয়নি। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের তাপমাত্রার ধরন বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রধান তিনটি বড় শহর—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ‘উষ্ণ নগরদ্বীপ’ বা আরবান হিট আইল্যান্ড তৈরি হচ্ছে। এত দিন মনে করা হতো, শুধু ঢাকার কিছু কংক্রিটময় ও সবুজহীন এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ গবেষণায় দেশের অন্য বড় শহরগুলোতেও এ প্রবণতা দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ছয়জন গবেষক মিলে গবেষণাটি করেছেন। গবেষক দলটি মনে করছে, অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে উষ্ণ নগর অঞ্চল তৈরি হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে শহর দুটির পুরোটাই শিগগিরই এ ধরনের চরম আবহাওয়া এলাকায় পরিণত হবে।

default-image

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটের গত ২০ বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে আমলে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। মূলত ভূ-উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশের ৫টি শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সঙ্গে প্রান্তের গ্রামাঞ্চলের তাপমাত্রার পার্থক্য পরিমাপ করা হয়েছে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, নগরায়ণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এরূপ বড় শহরগুলোতে এ ধরনের এলাকা দ্রুত বাড়ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ৭০ শতাংশ এলাকায় এ ধরনের উষ্ণ দ্বীপ তৈরি হচ্ছে। চট্টগ্রামে তা ৬০ শতাংশ।

‘বাংলাদেশের ৫টি প্রধান শহরের নগর উষ্ণ দ্বীপ: ধরন, কারণ ও প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি বিজ্ঞান সাময়িকী সাসটেইনেবল সিটি অ্যান্ড সোসাইটিতে চলতি মাসে বেরিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে ঢাকার দিনের তাপমাত্রার তীব্রতা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। চট্টগ্রাম ও খুলনায় বেড়েছে প্রায় আধা ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সিলেটে দশমিক ৩৭ ডিগ্রি। একসময় দেশের অন্যতম উষ্ণ এলাকা রাজশাহীতে বেড়েছে মাত্র দশমিক শূন্য ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এমন বাস্তবতায় আজ ২২ এপ্রিল পালিত হচ্ছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সারা বিশ্বে চেষ্টা করলে পৃথিবীর পুনরুদ্ধার সম্ভব’। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া এ দিবস আজ সারা বিশ্বেই ভার্চ্যুয়ালি পালিত হবে।

বিজ্ঞাপন

রাতে বেশি উষ্ণ চট্টগ্রাম

গবেষণা অনুযায়ী, রাতের তাপমাত্রা ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ঢাকায় যেখানে বেড়েছে দশমিক ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চট্টগ্রামে সেখানে দশমিক ৫২ ডিগ্রি। আর খুলনার রাতের তাপমাত্রা না বেড়ে বরং দশমিক ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। সিলেটে দশমিক ৩৪ ও রাজশাহীতে দশমিক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষ্যের তুলনায় ঢাকার তাপমাত্রার তীব্রতা তিন গুণের বেশি হারে বাড়ছে।

উপকূলীয় এই দুই শহরের তাপমাত্রা বাড়া-কমার কারণ এবং গবেষণাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই যুগ ধরে শহরগুলোর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রাও বাড়ছে। রাতে বঙ্গোপসাগর থেকে যে শীতল বায়ুর প্রবাহ চট্টগ্রাম শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যেত, সেটি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে রাতে শহরটির তাপমাত্রা আগের চেয়ে বাড়ছে। খুলনায় নগরায়ণ অন্যান্য শহরগুলোর তুলনায় কম হওয়ায় এবং নদী-জলাভূমি বেশি থাকায় সেখানে তাপমাত্রা কমেছে।

আর ঢাকাসহ অন্য বড় শহরগুলোতে উষ্ণ নগরদ্বীপ তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে আশরাফ দেওয়ান জলাভূমি ভরাট করা এবং গাছপালা কেটে ফেলাকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে শহরের ভবন নির্মাণের সামগ্রী হিসেবে পোড়ানো ইট এবং সিমেন্ট-বালির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এসব বস্তুতে তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) হিসাবে, ঢাকা শহরের ৭৫ শতাংশ এলাকা বর্তমানে কংক্রিট দিয়ে ভরাট হয়ে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে।

default-image

বেশি উত্তপ্ত মিরপুর-কাফরুল

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ঢাকার সবচেয়ে উত্তপ্ত এবং দ্রুত তাপমাত্রা বেড়েছে, এমন এলাকাগুলোর মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে মিরপুর-কাফরুল এলাকা। এরপর তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, পুরান ঢাকার বেশির ভাগ এলাকা, উত্তরা ও টঙ্গী। আর ঢাকার আশপাশের এলাকার মধ্যে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সদরে সবচেয়ে উত্তাপ বেড়েছে। এই এলাকাগুলোতে একসময় বনভূমি বেশি ছিল। কিন্তু সেখানে বন কেটে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে পোশাক কারখানা। তাই একই সঙ্গে শিল্পের তাপ ও জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। তবে রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সোনারগাঁও এবং কালীগঞ্জ এখনো অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকা হিসেবে টিকে রয়েছে।

গবেষণায় চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পাহাড়তলী, আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, ডবলমুরিং ও কোতোয়ালি এলাকা সবচেয়ে উত্তপ্ত হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে সীতাকুণ্ড, রাউজান, আনোয়ারা, বায়েজিদ বোস্তামী ও রাঙ্গুনিয়া এলাকা অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকা। এসব এলাকায় গত ২০ বছরে গড় তাপমাত্রা তেমন বাড়েনি। ওই এলাকাগুলোতে এখনো পাহাড় ও জলাভূমি বেশি এবং জনসংখ্যা কম থাকাই এ রকম আবহাওয়ার কারণ।

জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পরিবেশবিদ আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই তাপমাত্রা বাড়ছে। সেই সঙ্গে যদি আমাদের নিজেদের কারণে তাপমাত্রা আরও বেশি বাড়ে, তাহলে ওই শহরগুলোতে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ মানুষ উষ্ণতা থেকে বাঁচতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন করবে। এতে ভবনগুলোর ভেতরের তাপ নিয়ন্ত্রণে এলেও বাইরে বেড়ে যাবে।’

প্রবীণ এ অধ্যাপক বলেন, ‘করোনা মহামারি থেকে আমরা বুঝলাম, যেভাবে আমরা নগরায়ণ এবং উন্নয়ন করছি, তাতে আমরা বিপদ বাড়াচ্ছি। এই বিপদ যাতে আর না বাড়ে সে জন্য পরিবেশ রক্ষা ছাড়া কোনো উন্নয়নের চিন্তা করাই ঠিক হবে না।’

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন