default-image

সত্তর বছরের নাছির আহমেদের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার সদুরচরে। এই চরের গ্রাম হাক্কাঘাটা। গ্রামের সদুরচর বিলে ৪০ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চালাতেন নাছির আহমেদের ছেলে ও নাতিরা। তিন বছর ধরে বিলটি জলাবদ্ধ। শুরুর দিকে সাময়িকভাবে নাছির আহমেদের ছেলে-নাতিরা দিনমজুরের কাজ করতেন। দীর্ঘদিন চাষাবাদের জমি জলাবদ্ধ থাকায় এখন দিনমজুরের পেশাকেই স্থায়ীভাবে বেছে নিতে হয়েছে তাঁদের।

হাক্কাঘাটা গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদুরচর বিলে অন্তত আড়াই হাজার কৃষকের জমি আছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই এই বিল ছাড়া অন্য কোথাও জমি নেই। জলাবদ্ধতার কারণে তাঁরা এসব জমিতে এখন চাষাবাদ করতে পারেন না। ফলে সংসার চালাতে তাঁরা দিনমজুরির কাজ বেছে নিয়েছেন। তাঁদের সংখ্যা অন্তত কয়েক শ।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে হাক্কাঘাটা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিলের চারপাশে সড়ক। পূর্ব দিকে চর-পোটকা আর উত্তরে কুমারিয়া খাল। বিলের পানি নেমে কুমারিয়া খালে যায়। খালে পানি নামার জন্য গ্রামের সেরুর দোকান, জলিল মাঝি, সগির খলিফা, রবু, কাঞ্চন মাঝি, নুরুজ্জামান ও আবদুল খালেক ম্যানেজারের বাড়ির সামনে সাতটি কালভার্ট নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু সব কটি কালভার্টের মুখ বাড়ির মালিকেরা বালু ও মাটি ফেলে বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে তিন বছর ধরে বিলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। অন্তত ৯ জন কৃষক বিলের পানিতেই মাছ ও সবজির চাষ শুরু করেছেন।

গ্রামের আবদুর রব বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে ঋণ নিয়ে বিলেই মাছের খামার করেছিলেন। কিন্তু চলতি বছরেই দুই দফার বন্যায় মাছ বের হয়ে তাঁর দুই লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। অভাবে পড়ে অনেকে কম দামে জমি বিক্রি করছেন।

বিজ্ঞাপন

সদুরচর বিলটি পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন এ ইউনিয়নে কর্মরত। তিনি বলেন, সদুরচর বিলে প্রায় ৬০০ একর তিন ফসলি জমি আছে। রবি মৌসুমে ৫০০ একরের মতো জমিতে বোরো আবাদ হয়। বাকি জমিতে শাকসবজি, ডাল-পেঁয়াজ। এ জমি চাষাবাদের সঙ্গে প্রায় তিন হাজার কৃষক জড়িত। গত তিন থেকে চার বছরে চাষাবাদের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রতিবছর এই বিলের জমিতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ফসল উৎপাদন করা হতো।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১০ বছর আগে আবদুল জলিল মাঝি নামের এক ব্যক্তি বিলের উত্তর পাশে জমি কিনে বাড়ি করার পরই জলাবদ্ধতার সূত্রপাত। বিলের পানি ওই স্থান দিয়েই খালে নামত। কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতি বর্ষায় জলিলের বাড়ির পাশে নালা কেটে পানি বের করতেন। কিন্তু কেউ একা গেলে আবদুল জলিল ও তাঁর স্ত্রী দা নিয়ে তাড়া করেন। পরে তৎকালীন ইউপি সদস্য আবদুল হক নালার জমি কিনে নিতে কৃষকদের পরামর্শ দেন। কৃষকেরা ৮ শতাংশ জমি কেনার জন্য ২০ হাজার টাকা চাঁদা তুলে ইউপি সদস্যকে দেন এবং পরিষদের নামে দলিল করতে বলেন। পরিষদ জমির দলিল না করে ওই স্থানে পাকা নালা নির্মাণ করে। চার বছর আগে ইউপি সদস্য আবদুল হক মারা যাওয়ার পর আবদুল জলিল ওই নালা ভরাট করে ঘর তোলেন। তাঁর দাবি, ইউপি সদস্য আবদুল হক জমির জন্য তাঁকে কোনো টাকা দেননি। পরে কৃষকেরা নালার জমি উদ্ধার করতে গেলে আবদুল জলিল কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তখন কৃষকেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও সমাধান পাননি।

পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন বলেন, সমাধান করতে গিয়ে তাঁর পরিষদের এক সদস্য মামলার আসামি হয়েছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান বিষয়টি জানেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছেন না।

এ বিষয়ে সদর ইউএনও মিজানুর রহমান বলেন, খোঁজ নিয়ে সমস্যাটি সমাধানের ব্যবস্থা নেবেন তিনি।

মন্তব্য পড়ুন 0