কংক্রিটের ঢাকা শহরে বেড়েছে সবুজ

প্রথম আলো ফাইল ছবি
প্রথম আলো ফাইল ছবি

অবকাঠামো, সবুজ এলাকা, জলাশয় ও খোলা জায়গায় ভারসাম্য রেখে গড়তে হয় একটি শহর। কিন্তু গত ২০ বছরে ঢাকা শহরে কংক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকা বেড়েছে অনেক। আশঙ্কাজনক হারে কমেছে জলাশয় ও খোলা জায়গা। তবে আশার কথা, এই সময়ে সবুজে আচ্ছাদিত এলাকা কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ঢাকা শহরের ৬৫ ভাগ কংক্রিট বা অবকাঠামোতে আচ্ছাদিত ছিল। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ৮২ ভাগ। এই সময়ে জলাশয় ও খোলা জায়গা প্রায় ১৪ ভাগ থেকে কমে ৫ ভাগের নিচে নেমেছে। আর সবুজে আচ্ছাদিত এলাকা ৬ দশমিক ৬৯ ভাগ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২০ হয়েছে। তবে এই সবুজের মধ্যে শহরে ছাদকৃষি বা ছাদবাগান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরের প্ল্যানার্স টাওয়ারে সংবাদ সম্মেলন করে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ‘সবুজ এলাকা,
জলাশয়, খোলা উদ্যান ও কংক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকার বিদ্যমান অবস্থা’ শীর্ষক এই সমীক্ষায় ‘রিমোট সেন্সিং ইমেজ বিশ্লেষণ’ ও জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পুরোনো ৯৩টি ওয়ার্ডের (আয়তন ১৩৪ বর্গকিলোমিটার) ভূমি ব্যবহার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী ঢাকা শহরের মধ্যে মগবাজার, ইস্কাটন, সেগুনবাগিচা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট এলাকায় সবুজের আচ্ছাদন বেশি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মিরপুর সেকশন ৭, পল্লবী ওয়াপদা কলোনি, দ্বিগুণ, সেনানিবাস, রূপনগর, দুয়ারীপাড়া, রাজাবাজার, ইন্দিরা রোড, মণিপুরিপাড়া, শেরেবাংলা নগর এলাকায় এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও লালবাগ এলাকায় সবুজায়ন বেড়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। সবুজে আচ্ছাদিত এলাকা বাড়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, জলাভূমি ভরাটের কারণে এমনটি হয়েছে। জলাভূমি ভরাটের পর এটি অনেক সময় পতিত থাকে। এরপর এতে ঘাস, লতাগুল্ম ও গাছ জন্মে, যেমনটি হয়েছে দিয়াবাড়ি এলাকায়। এ ছাড়া সমীক্ষায় বিদ্যমান পার্ক, উদ্যান ও হাতিরঝিলও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

>

শহরকে বাসযোগ্য করতে মোট ভূমির ১৫-২০ শতাংশ সবুজ এলাকা, ১০-১৫ ভাগ জলাশয় এবং হাঁটা দূরত্বের মধ্যে পার্ক, খোলা জায়গা থাকা প্রয়োজন

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, একটি শহর বাসযোগ্য করার জন্য মোট ভূমির ১৫-২০ শতাংশ সবুজ এলাকা, ১০-১৫ ভাগ জলাশয় এবং হাঁটাদূরত্বের মধ্যে প্রত্যেক মানুষের জন্য ৯ থেকে ৫০ বর্গমিটার পার্ক, উদ্যান বা খোলা জায়গা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়গুলোর প্রতিটির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে ঢাকা শহরে।

জলাশয় ও খোলা জায়গা

সমীক্ষা অনুযায়ী জলাশয় সবচেয়ে বেশি আছে বারিধারা, মহাখালী, গুলশান, বনানী, বাড্ডা, রামপুরা, তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। সোয়ারী ঘাট ও বংশাল এলাকায় কোনো জলাশয় নেই। আর সামান্য পরিমাণে জলাশয় আছে বড়বাগ, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহিমপুর, সিদ্দিকবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকায়।

লালমাটিয়া, বছিলা, রায়েরবাজার এলাকায় খোলা জায়গা তুলনামূলকভাবে বেশি। খিলগাঁও, মগবাজার, পশ্চিম মালিবাগ, গোড়ান, মেরাদিয়া, বাসাবো, রাজারবাগ, মুগদাপাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক কলোনি, আরামবাগ, মতিঝিল, শাহজাহানপুর, চামেলীবাগ, আমিনবাগ, শান্তিনগর, পল্টন, সোয়ারী ঘাট, বংশাল, সিদ্দিকবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকায় খোলা জায়গা নেই বললেই চলে।

শুধুই কংক্রিট

সোয়ারী ঘাট, বংশাল এলাকাসহ পুরান ঢাকার বড় একটি অংশই শতভাগ কংক্রিটে আচ্ছাদিত। এ ছাড়া খিলগাঁও ‘বি’ জোন, খিলগাঁও পূর্ব হাজীপাড়া, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ এবং মালিবাগ বাজার রোড ও সবুজবাগের একাংশ নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির ২৩ নম্বর ওয়ার্ড, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, কাঁঠালবাগান, নর্থরোড, সার্কুলার রোড, গ্রিন কর্নার, গ্রিন স্কয়ার ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ডিএসসিসির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডও শতভাগ কংক্রিটে ঢাকা।

সংবাদ সম্মেলনে নগর বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে অবকাঠামো, সবুজ এলাকা, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থানের ভারসাম্য অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বাসযোগ্যতা ও বায়ুদূষণের বিচারে ঢাকা শহরের অবস্থান তলানিতে। এখন এই শহরকে বাঁচাতে সরকার, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। পরিকল্পনা ও আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুসারে ভূমি পুনঃ উন্নয়নের (রি-ডেভেলপমেন্ট) উদ্যোগ নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা শহরের এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নগর-পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আত্মস্থ করে সে অনুযায়ী কাজ করা, এলাকাভিত্তিক পার্ক, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থানের জন্য প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সভাপতি অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, ‘ঢাকা শহরকে আমরা “প্রফিট মেকিংয়ের” জায়গা হিসেবে বিবেচনা করতে দেখছি। যে যার মতো পারছেন, শুধু লাভ করতে চান।’ এই মানসিকতা পরিহারের পাশাপাশি গণপরিসর, গণপরিবহন ও নাগরিক পরিষেবায় সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম আবুল কালাম, সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।