default-image

করোনা মহামারির মধ্যেই ধেয়ে আসছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রস্তুতি চলছে জোরে–শোরে। মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান করতে পারে, সে জন্য নানা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে বলা হয়েছে, যাতে মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। অনেক জেলায় খেতে থাকা বোরো ধান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পান দেশের খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চলের ওপর দিয়ে মঙ্গলবার শেষ রাত থেকে বুধবার বিকেল অথবা সন্ধ্যার মধ্যে বয়ে যেতে পারে। এ নিয়ে জরুরি সভা করেছে উপকূলীয় জেলা ও উপজেলাগুলোর দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটি।

এদিকে ঢাকায় আট বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শক দল ঘূর্ণিঝড়ের সময় করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেছে। এদের একজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শাহ মুনির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কঠিন হবে। কিন্তু জীবন রক্ষার তাগিদে অনেকেই সেখানে আশ্রয় নেবেন। এ ক্ষেত্রে আমরা দুটি পরামর্শ দিয়েছি। প্রথমত আশ্রয় নেওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য মাস্ক সরবরাহ করতে হবে। এবং আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা যেন নিয়মিত সাবান–পানি দিয়ে হাত ধুতে পারেন, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

 এদিকে গতকাল পর্যন্ত উপকূলীয় জনপদে ঘূর্ণিঝড়ের তেমন প্রভাব ছিল না। গতকাল সোমবার দিনভরই উপকূলীয় জেলাগুলোর আবহাওয়া ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল, সঙ্গে ভ্যাপসা গরম। দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া বিভাগ।

 তবে গতকাল পর্যন্ত বাগেরহাটের মোংলা বন্দরে স্বাভাবিকভাবেই চলেছে জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজ। এই বন্দরে বর্তমানে ১১টি দেশি-বিদেশি জাহাজ অবস্থান করছে।

 এদিকে মাঠের পাকা বোরো ধান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বাগেরহাটের ৮৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলার কৃষি বিভাগ। এ জেলায় ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও উপজেলা পর্যায়ের স্কুল ও কলেজগুলো খুলে রাখতে বলা হয়েছে, যাতে মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, আম্পান মোকাবিলার প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়গুলোও মাথায় রাখা হচ্ছে।

 বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ইতিমধ্যে ২ হাজার ৪৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল দল। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপত্তি খেতের বোরো ধান নিয়ে। এ বিভাগে এখনো ৩৮ ভাগ বোরো ধান খেতেই রয়ে গেছে।

 বরিশালের কৃষি বিভাগ বলছে, বরিশাল বিভাগে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হওয়ায় ছয় লাখ টনের বেশি বোরো চাল উৎপাদনের আশা করছে তারা। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ধান কাটা শুরু হয়েছে। চলতি মে মাসের শেষভাগে এই ধান কাটা শেষ হওয়ার কথা। গতকাল পর্যন্ত বিভাগের ছয় জেলায় ৬২ ভাগ বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে। বাকি ধান এখনো খেতে। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলেছেন, কৃষি বিভাগের হিসাবের চেয়ে বেশি বোরো ধান এখনো খেতে রয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল ছাড়া বাকি পাঁচ জেলার জমি নিচু হওয়ায় বোরো আবাদ হয় একটু দেরিতে। এ জন্য ধান পাকেও দেরিতে। বরগুনার আমতলী উপজেলার আঠারোগাঠিয়ার কৃষক আজমল হোসেন বলেন, চার একর জমির ধান কেবল কাটতে শুরু করেছেন। অনেক ধান এখনো কাঁচা। পাকতে আরও এক সপ্তাহ লাগবে।

 বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার ইয়াসমিন চৌধুরী বলেন, সামাজিক দূরত্ব যাতে বজায় রাখা যায়, সে জন্য আরও ২ হাজার ৫২৬টি স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর ফলে ৪ হাজার ৯৭২টি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।

 বরিশালসহ বিভাগের ছয় জেলায় মাইকিং শুরু করেছে ‌‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি’ (সিপিপি)। ছয় জেলায় ২৫ হাজার সিপিপির স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বিপদ সংকেতের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

 বরগুনার তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্গম এলাকাগুলোতে অবস্থানরত মানুষের জরুরি চলাচলের জন্য নৌযান ও যানবাহন রিকুইজিশন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত সোলার সিস্টেম সংগ্রহে রাখা হয়েছে।

 সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক। এই দুই ইউনিয়নের প্রায় দেড় হাজার মানুষ এর মধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রথম অবস্থায় বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোববার সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে এ সভা হয়। সেখানে আরও সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কেন্দ্রগুলোতে মাস্ক ও হাত ধোয়ার সাবান রাখা থাকবে। নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে ধাত্রী ছাড়াও চিকিৎসক রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই সব এলাকায় বিশেষ খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

 গাবুরার চাঁদনীমুখো এম এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া বেল্লাল হোসেন (৪২) ও রাবিয়া খাতুন (৬০) জানান, ঘূর্ণিঝড় আইলায় তাঁদের সর্বস্ব শেষ হয়ে যায়। এ ঝড়ের খবর পেয়ে তাঁরা রোববার সন্ধ্যায় আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। এখন পর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, মুখে মাস্ক দিয়ে আছেন তাঁরা। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাও আছে আশ্রয়কেন্দ্রে।

 তবে শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউল হক জানান, অনেক মানুষ এখনই আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চাইছেন না। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, মানুষ না আসতে চাইলে প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য একটা পরিবারকে এক স্থানে দেওয়া হবে।

 খুলনায় ৩৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এলাকায় অবস্থান করা মানুষ। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাবে। এতে লোনা পানিতে পুরো এলাকা ভেসে যাবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন