বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঘাসবনের পাখিগুলো আমাদের প্রায় চোখের আড়ালেই থাকে। এ দেশে যত জলচর পাখি আসে, তার চেয়ে বেশি পরিযায়ী হয়ে আসে ঘাসবনের পাখি। প্রায় অর্ধশত প্রজাতির ফুটকি ও চুটকি প্রজাতির ঘাসবনের পাখি আমাদের দেশে দেখা যায়। পুরো হাওর এলাকার ঘাসবন ও জলার বনে এদের শীতে বসবাস। মূলত পোকা ধরে ধরে খায়। শীতে এসব জলাশয়ের পাশ দিয়ে হাঁটলে পাখির ডাকে মুগ্ধ হতে হয়।

ঘাসবনের প্রায় সব প্রজাতিই পরিযায়ী। বছরের প্রায় অর্ধেকটা সময় এরা আমাদের দেশে কাটায়। তারপর এরা প্রজননকাল কাটানোর জন্য পাড়ি দেয় সাইবেরিয়া, রাশিয়া আর মঙ্গোলিয়ার পথে। রিংগিং ক্যাম্পে পাখি হাতের মুঠোই এলেই অবাক হই! পাঁচ গ্রাম ওজনের একটি হলদে ভ্রু ফুটকি অথবা পাতি চিফচ্যাফ প্রায় ১৫ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আমাদের দেশে এসেছে! এ পথে পাড়ি দিতে হয় বিশাল এক হিমালয় পর্বতমালা। বুকের পালকের কাছে ফুঁ দিলে একটু হলদে চর্বি দেখা যায়। শীতের শেষে এই চর্বিটুকু আবার বাড়তে থাকে। কারণ, তার দীর্ঘ পরিযায়নের শক্তিটুকুই হলো এই চর্বি।

ফুটকি, চুটকি, টেসিয়া, ফিদ্দা অথবা চেরালেজ যে পাখিই রিংগিং টেবিলে পাই না কেন, তার প্রাণটুকুর ধুকধুক খুব ভালো লাগে। সব সময়ই আমরা পাখিটি ছেড়ে দেওয়ার সময় আদর করি। রিং পরিয়ে হাতের মুঠটি ফাঁকা করলেই ফুটকিরা ফুড়ুত করে উড়াল দেয়। মনে মনে ভাবি, আবার যেন তাকে হাতে পাই। ঠিক অনেকবারই এ রকম ঘটেছে। প্রতিবছরই আমরা ১০টির বেশি রিং পরানো পাখি পুনরায় ধরতে পারি। তখন আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না এটা ভেবে যে পাখিটি বেঁচে আছে আর একই এলাকায় ফিরে এসেছে!

default-image

গত ১০ বছরে পাঁচ হাজারের মতো ঘাসপাখিতে আমরা রিং পরিয়েছি। প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণের জন্যই আমাদের শুভকামনা ছিল। প্রথম বছরগুলোতে আমরা ঘাসবনে খুব ভালো পাখি পেতাম। সকালজুড়ে আমাদের ব্যস্ততা। আস্তে আস্তে দেখলাম হাকালুকি হাওরের ঘাসবনগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে। পাশুয়া হাওর চোখের সামনে একটি ধানখেতে পরিণত হলো। বাইক্কা বিলের ঢোলকলমির বন প্রায় শেষ। টাঙ্গুয়ার ঘাসবনের কান্দাগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এত সব বন ধ্বংসের ফলে ঘাসবনে আমাদের পাখি রিং পরানোর হারও গত ১০ বছরে অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

পরিযায়ী পাখি মানেই কিন্তু শুধু হাঁস বা সৈকত পাখি নয়। চোখের আড়ালে আরও হাজারো ঘাসবনের পরিযায়ী আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এসব প্রাণ আমাদের জলাশয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই, সচেতন মানুষের কাছেও এই ঘাসপাখিগুলো প্রায় অচেনা।

ঘাসবনের পাখি বাঁচাতে আমাদের খুব বেশি কিছু করার দরকার পড়ে না। ঘাসগুলো টিকিয়ে রাখলেই চলে। হাওরের প্রতিটি ঘাসবনে এখন গরু-মহিষের পাল চলাচল করে। এই গোচারণ ভূমিই পাখিগুলোর প্রধান শত্রু। প্রতিটি হাওরের সামান্য একটি বনে হাজারো পাখির আশ্রয় হয়, যে পাখিগুলো হাজার হাজার মাইল পথ বেয়ে এ দেশে জলাশয়ের জঙ্গলে আসে, তাদের জন্য একটুকরো ঘাসবন ছেড়ে দিন।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন