ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস এবং বাংলাদেশ

১২ নভেম্বর ২০২০। আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৭০ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশ উপকূলে স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের জীবনহানিসহ সম্পদের সীমাহীন ক্ষতি সাধিত হয়। ইতিহাসের সেই ভয়াবহ দিনটিকে স্মরণ করা এবং নীতিনির্ধারক, পেশাজীবীসহ সব জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের আজকের এই আয়োজন।
‘সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চের (এইচবিআরসি)’ নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেকের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘১২ নভেম্বর ১৯৭০ ভোলা সাইক্লোন’ স্মরণে প্রথম আলো, এইচবিআরসি এবং বিএসআরএমের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান ‘ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস এবং বাংলাদেশ’। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের সর্বাধিক ভয়ংকর এই ঘূর্ণিঝড় পর্যালোচনা করলে জীবন ও সম্পদহানির উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে দুর্বল আগাম সতর্কসংকেত, জনসচেতনতার অভাব, দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচির অনুপস্থিতি এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব অন‍্যতম।
আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ঘূর্ণিঝড়ের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শিত হয়। দ্বিতীয় পর্বে ছিল দুজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা। শেষে সাতটি সুপারিশের মাধ‍্যমে বিশেষ এই আলোচনা অনুষ্ঠান শেষ হয়।
প্রামাণ্যচিত্রে বন‍্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণসহ কেন বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ, তার বিষদ বর্ণনা শেষে বলা হয়, বঙ্গোপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সৃষ্ট অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানে। পৃথিবীর ১৩টি মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ৯টি এবং মোট ঘূর্ণিঝড়ের প্রতি ১০টির মধ্যে ১টি সৃষ্টি হয় উত্তর ভারত মহাসাগর অঞ্চলে, যার প্রতি ৬টির মধ্যে একটি আঘাত হানে বাংলাদেশে।

বিজ্ঞাপন

জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বিবেচনায় উপকূলীয় অঞ্চলকে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে জীবনহানি হ্রাসে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বর্তমানে কমবেশি ৫০০০ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে বেশ কিছু আশ্রয়কেন্দ্র কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি হ্রাসকল্পে ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক মেরামত ও শক্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাবিত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সঠিক পরিকল্পনা, কাঠামোগত নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে আগামী দিনে ঝুঁকিমুক্ত উপকূল গঠনের উদ‍্যোগে পেশাদারির পরিচয় প্রদান এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারের মাধ‍্যমে প্রামাণ্যচিত্রটি শেষ হয়।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ঘরবাড়ি ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং স্থায়িত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করা হয়। প্রথমেই আলোচনায় অংশ নেন প্রকৌশলী এ এইচ এম মতিউর রহমান। উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় আরসিসি ঘরবাড়ি ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য করণীয় বিষয়ে প্রকৌশলী মতিউর রহমান বেশ কিছু পরামর্শ দেন। তিনি কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধিসহ পানি ও সিমেন্টের অনুপাত সীমিত রাখা, কম্পোজিট সিমেন্ট টাইপ-২ ব‍্যবহার, এডমিকশ্চারের ব‍্যবহার, ক্লিয়ার কভার বাড়ানো, এগ্রিগেট হিসেবে ব্রিক চিপস ব্যবহার না করে স্টোন চিপস ব্যবহার এবং পানের উপযোগী পানির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
উপকূলীয় এলাকায় আরসিসি স্থাপনা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে রডের গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাকিব আহসান। অধ্যাপক রাকিব আহসান স্থাপনায় ব্যবহৃত রডের গুণাগুণ বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। যেহেতু উপকূলীয় এলাকা লবণাক্ত, সেহেতু ভালো গুণসম্পন্ন রডের ব্যবহার এবং মরিচা পড়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এপক্সি কোটেড রড ব‍্যবহারের ওপর জোর দেন।

যেহেতু উপকূলীয় এলাকায় কংক্রিট তৈরির উপযোগী পানি পাওয়া দুষ্কর এবং কংক্রিটের গুণগত মান রক্ষা করা কঠিন, সেহেতু প্রিকাস্ট প্রি-ফেব্রিকেটেড নির্মাণ প্রযুক্তি সর্বাধিক উপযোগী হিসেবে তিনি মত প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থাগুলো আমাদের বিল্ডিং কোডে নির্দেশিত আছে। অধ্যাপক রাকিব আহসানের বক্তব‍্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা পর্ব শেষ হয়।
প্রামাণ্যচিত্র ও আলোচনা শেষে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঘরবাড়ি ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে ৭টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। সুপারিশগুলো নিম্নরূপ—
১.
প্রিকাস্ট প্রি-ফেব্রিকেটেড নির্মাণ প্রযুক্তি উপকূলীয় এলাকার জন্য সর্বাধিক উপযোগী।
২.
ইপক্সি কোটেড মরিচাপ্রতিরোধী রড উপকূলীয় অঞ্চলের স্থাপনার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করবে।
৩.
পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট টাইপ-১-এর চেয়ে পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট টাইপ-২ উপকূলীয় এলাকায় স্থাপনার স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে অধিকতর উপযোগী।
৪.
কংক্রিটের কোর্স এগ্রিগেট হিসেবে ইটের খোয়ার ব্যবহার স্থাপনার স্থায়িত্ব নষ্ট করে।
৫.
কংক্রিট তৈরিতে এডমিকশ্চারের ব্যবহার পানির ব্যবহার হ্রাস করে কংক্রিটের শক্তি ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করে।
৬.
কংক্রিট তৈরিতে পানের উপযোগী পানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কোনো অবস্থাতেই লবণাক্ত পানি ব্যবহার করা যাবে না
৭.
বিল্ডিং কোডে নির্দেশিত উপকূলীয় অঞ্চলের আরসিসি স্থাপনার জন্য বিশেষ বিধানগুলো দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে হবে।
উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় এবং দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত স্থাপনা ও শক্তিশালী নির্মাণ নিশ্চিত করে, ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশায় আয়োজন শেষ হয়। বিজ্ঞপ্তি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0