গত ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে এমটি টোটাল নামের একটি জাহাজের ধাক্কায় তেলবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন-৭ সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল নিয়ে ডুবে যায়। এ ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় ও তথ্য সংগ্রহে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল ২৩ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনে সমীক্ষা চালায়। তাঁদের সমীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে এ আয়োজন

default-image

পরিকল্পনার ঘাটতি ও সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান না থাকায় সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর তা অপসারণ করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে নিয়মিত জোয়ারভাটা ও দুর্ঘটনার পর নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষতি কমেছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ দলের ‘সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
সমীক্ষায় প্রতিবেদনে সুন্দরবনের জলজ প্রাণী এবং সুন্দরবনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকায় কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য সুপারিশ করা হয়। অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণে দৃশ্যমান কোনো প্রভাব দেখা না গেলেও সূক্ষ্ম প্রভাব পড়ার কথা ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, স্বল্প সময়ে তা বোঝা সম্ভব না।
সুন্দরবনের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি এলাকার মধ্য দিয়ে তেল পরিবহন করা বন এবং বনজীবীদের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তেল নিঃসরণ ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার তেল ছিল সাউদার্ন সেভেন অয়েল ট্যাংকারে। তেল দুর্ঘটনার পর উজানে মংলা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার ও ভাটিতে হরিণটানা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তেল নদীর দুই পাড়, খাল ও খাঁড়ির মধ্যে আটকে যায়, যা সুন্দরবনের জন্য ব্যাপক আশঙ্কার জন্ম দেয়।
ফার্নেস তেল বেশ আঠালো হয়। তবে পানিতে ছড়িয়ে পড়ার পর এই তেলের রাসায়নিক উপাদান পরিবর্তিত হয়ে যায়। পানির সংস্পর্শে এসে এই তেল বাষ্পীভবন, তৈলাক্ত আঠালো পদার্থে পরিণত হওয়া, চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়া, অক্সিজেনের সঙ্গে মিশ্রণে মরিচাযুক্ত হয়।
তেলের একটি নমুনা পাঠানো হয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানিতে। কিন্তু প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই পরীক্ষার ফলাফল বিশেষজ্ঞ দলের হাতে এসে পৌঁছায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের একটি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ফার্নেস তেলের অবশেষের মধ্যে সালফারের মিশ্রণ রয়েছে।
মাটির নিচে চাপা দেওয়া তেল: সমীক্ষা দলটি শ্যালা নদী ও পশুর নদের ওপরে পাতলা তেলের আস্তরণ দেখতে পায়। দুই পাড়ের গোলপাতা এবং ঘাসের মধ্যে তেল জমে ছিল। তেল জমে থাকার এই ধরন দেখে তারা বলেছে, তাপমাত্রা বাড়লে সুন্দরবনের গাছ থেকে তেল গলে পানিতে পড়বে। গ্রীষ্মকালে গাছ থেকে আরও তেল গলে পানির সঙ্গে মিশবে।
শুরুতে নেওয়া ভিডিওচিত্রের সঙ্গে সমীক্ষা দলের পর্যবেক্ষণ তুলনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অপসারণ প্রক্রিয়ায় ফলাফল হিসেবে মনে হয়েছে নদীর পাড়ে জমে থাকা তেল কাদামাটির নিচে চাপা দেওয়া হতে পারে। প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটায় নদীর পাড়ে পলি পড়েও তেল মাটির নিচে চাপা পড়েছে।
পেশা ও জীবিকায় প্রভাব: সমীক্ষায় ১১টি মাছ, পাঁচটি চিংড়ি আহরণকারী ও ২৬টি কাঁকড়া সংগ্রহকারী দলের সঙ্গে কথা বলা হয়। চাঁদপাই, জয়মনিরগোল ও আন্ধারমানিক এলাকার জেলেরা বলেছেন, তাঁরা আগের চেয়ে কম মাছ পাচ্ছেন। অন্যদিকে তাম্বুলবুনিয়া, আলকেরচর ও হরিণটানা এলাকার জেলেরা বলেছেন, তাঁরা কিছুটা কম মাছ পাচ্ছেন।
১৮ শতাংশের বাড়িতে পালন করা হাঁস এবং প্রায় ৬ শতাংশের খাওয়ার পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তেল পড়ার পর নদীতে মাছ ধরার পরিমাণ কমেছে। তবে ৩৯ শতাংশ বলেছেন, মাছ আগের মতো ধরা পড়ছে। আর আড়াই শতাংশ বলেছেন মাছ বেড়েছে।
বন্য প্রাণীর ওপরে প্রভাব: ২৩ থেকে ২৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সমীক্ষা দলটি ৮২টি এলাকায় ১০৮টি বন্য প্রাণীর দেখা পায়। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ প্রাণীর দেহে তেল দেখা গেছে।
স্বাস্থ্যগত প্রভাব: সমীক্ষায় তিনটি দলীয় আলোচনা, ১৩টি সাক্ষাৎকার ও ১৫৯টি খানাভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে ওই নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয়। বাতাসের সঙ্গে, গোসলের সঙ্গে, মাছ খেলে তার সঙ্গে, খাওয়ার পানির সঙ্গে এবং তেল স্পর্শ করলে তা মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এই তেলে পলি সাইক্লিক এরোমেটিক হাইড্রোকার্বন, সালফার এবং নাইট্রোজেনযুক্ত ভারী ধাতু থাকে। যার সংস্পর্শে এলে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ত্বক, চোখ, কণ্ঠনালিতে সমস্যা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ও ডায়রিয়া হতে পারে।
১৫৯ জনের মধ্যে ১১৫ জন বলেছেন, তাঁরা তেল সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে ৫৫ জন বলেছেন তাঁরা মাথাব্যথায়, ২৭ জন চোখ জ্বালাপোড়া করা, আটজন বমি বমি ভাব এবং চারজনের শরীরে চুলকানি হয়েছে। তবে এঁদের কেউই এ জন্য হাসপাতালে ভর্তি হননি। প্রায় ৮২ শতাংশ গ্রামবাসী বলেছেন, তেলের কারণে তাঁদের মাছ ধরার যন্ত্র ও ৮১ শতাংশের পোশাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সুন্দরবন সম্পর্কে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো বলেছে, ‘এর প্রাকৃতিক সম্পদ অমূল্য।’ বিশ্বসেরা বেঙ্গল টাইগার আর ডলফিনের সবচেয়ে বড় বসতি এলাকাও এই বন। আর জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটির প্রতি বর্গমিটারে যে পরিমাণ জীববৈচিত্র্য রয়েছে, তা একমাত্র ব্রাজিলের আমাজন বনের সঙ্গেই তুলনীয়।
এককথা সুন্দরবন ‘বিশ্বের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের আধার।’ বনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন, বাঘের সবচেয়ে বড় বসতি এলাকা, আমাজনের পর সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করার সময় বলা হয়েছিল, এই বনের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য অমূল্য।

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন