default-image

প্রায় ১৫ বছর আগে প্রথম টিউলিপ দেখি চীনের কুনমিং শহরে। তারপর ইউরোপ-আমেরিকায় অসংখ্যবার দেখা হয়েছে এই স্বর্গীয় অপ্সরীর সঙ্গে। বিস্তৃত পরিসরে এই ফুলের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। শুধুই কি মনোমুগ্ধকর? আসলে টিউলিপের বাগানে ছড়িয়ে থাকে একধরনের ঘোর, নেশা আর মায়াজাল। এর বর্ণাঢ্যতা উপেক্ষা করা সত্যিই কঠিন। এ কারণে সারা পৃথিবীতে টিউলিপপ্রেমীর সংখ্যাও কম নয়। মৌসুমি বাগানে মুগ্ধতা ছড়াতে আবিষ্কৃত হচ্ছে টিউলিপের আরও নতুন নতুন আবাদিত জাত।

আমাদের দেশেও টিউলিপপ্রেমীরা হাত গুটিয়ে বসে নেই। গত কয়েক বছরে দেশে অনেক কসরত করে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ ফুলও ফুটিয়েছেন। কিন্তু এ বছরই প্রথম গাজীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে বড় পরিসরে টিউলিপবাগান আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সন্দেহ নেই, উদ্যোক্তা এর জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন, অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছেন। কন্দ এনেছেন সেই নেদারল্যান্ডস থেকে। কিন্তু সফল তো হয়েছেন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিউলিপের চাষ অনেকটা চ্যালেঞ্জের মতোই। নিজের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে কয়েক বছরের ঐকান্তিক চেষ্টায় তিনি নিজের রচিত স্বপ্ন ছুঁয়েছেন। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কেওয়া দক্ষিণ গ্রামে মো. দেলোয়ার হোসেনের এই টিউলিপবাগান দেখার জন্য মানুষের ঢল নেমেছে। উদ্যোক্তাকে ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। অজস্র মানুষের এই আনন্দঘন উদ্‌যাপন আমাদের কাছে আরেকটি বার্তা পৌঁছে দিয়ে গেল। দেশে এই ফুলের বাণিজ্যিক চাষ অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানে ৪ রঙের প্রায় ১ হাজার ১০০ গাছে টিউলিপ ফুটেছে। এর জন্য প্রয়োজন হয়েছে বিশেষ যত্নের। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়েছে তাপমাত্রা। টিউলিপের বাগান পরিদর্শনে গেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরিচালিত ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদ মেহেদী মাসুদ। তিনি জানান, দেশে উৎপাদিত গ্লাডিওলাস, জারবেরা বা রজনীগন্ধা ইত্যাদি ‘কাট-ফ্লাওয়ার’-এর মতো টিউলিপেরও যথেষ্ট বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বাজারে চাহিদা মিটিয়ে এ ফুল বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। কৃষি বিভাগ থেকেই টিউলিপ চাষে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার মাধ্যমে সহযোগিতা করা যেতে পারে। বর্তমানে সারা দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপন্ন ফুলের হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। তার সঙ্গে অনায়াসেই যুক্ত হতে পারে টিউলিপ।

সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে টিউলিপের চাষ করছে। আবার গ্রিনহাউসেও প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপন্ন হচ্ছে টিউলিপ। মূলত টিউলিপের স্বর্গভূমি নেদারল্যান্ডস। সেখানে প্রতিবছর তিন বিলিয়ন কন্দ রপ্তানির জন্য উৎপাদন করা হয়।

মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত তিয়ান শান পর্বতের ঢালু অঞ্চল বুনো টিউলিপের প্রাকৃতিক আবাস। অবশ্য হিমালয় অঞ্চলেও প্রাকৃতিকভাবে টিউলিপ জন্মে। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য অঞ্চলে টিউলিপের চাষ শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৭৫ প্রজাতির টিউলিপ রয়েছে। তুরস্কের জাতীয় ফুল টিউলিপ। সাধারণত ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় টিউলিপ ভালো জন্মে। মৌসুম শুরুর আগে কন্দ বা বীজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেখান থেকে তিন মাস সময়কাল ভার্নালাইজেশন বা শৈত্য প্রদানকরণ করে দেশে এনে লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন