default-image

ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের পথটা বেশ দীর্ঘ। প্রায় প্রতিবছরই এ পথে যাওয়া হয় তেঁতুলিয়ার কাজীপাড়ার চা–বাগানে পাখি দেখতে। শীতকালে পাকা রাস্তার পাশ ধরে চললে একদম সবুজ ধানখেত। ধান পাকলে পুরো মাঠ হয়ে যায় সোনালি। আর ধান কাটার পর এই বিরান ভূমি হয়ে যায় বাদামি। কয়েক বছর ধরে পাখি দেখিয়েরা এ পথে কী পরিমাণ বগা দেখা যায়, তার গণনা করছেন। শুমারির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কৃষকের মাঠে যে পরিমাণ জমি ও জলাশয় আছে, তাতে বগার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

আমাদের জলের প্রিয় পাখিটির নাম বগা। ধবধবে সাদা বগা ও টলটলে পানির জলাশয় আমাদের সবারই স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। বগাশূন্য জলাশয় আমরা কল্পনা করতে পারি না, চাইও না। অথচ প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে বগা ও বক পরিবারের পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পাখিশূন্য একটি বিলে অন্য বুনো প্রাণীরা কীভাবে টিকে থাকবে, তা গবেষক হিসেবে সব সময় আমাকে নাড়া দেয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে বক পরিবারের প্রজাতি সংখ্যা ১৮। এর মধ্যে পাঁচ প্রজাতির বগা দেখা যায়। বগাদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে কম দেখা যায় বড় বগা। ছোট বগা আর মাঝলা বগার সংখ্যা প্রায় সমান সমান। বাংলাদেশের একমাত্র পরিযায়ী বগার নাম প্রশান্ত শৈল বগা।

দেখা যায় শীতকালে, শুধু সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে। তা–ও আবার সংখ্যায় পাঁচটির কম। কয়েক বছর ধরে এর দেখাও মিলছে না। অন্য প্রজাতিটি হলো গো বগা।

এই প্রজাতিও অনেক কমে গেছে, গো বগা মাছের বদলে পোকা খেয়ে বেঁচে থাকে। কৃষকের মাঠে চাষের সময় এদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। ধান কাটার পর হালকা পানিতে পোকামাকড়ের আগমন বেড়ে যায়। জমি চাষের সময় চাষির পেছনে পোকাখেকো গো বগা দেখা মেলে। গরু-মহিষের শরীর থেকেও গো বগা পোকা ধরে খায়। তবে আমাদের দেশে এখন যে পরিমাণ গরু-মহিষ আছে, সে পরিমাণ গো বগা নেই। ধানখেতেও অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পোকামাকড় কমেছে।

রাজশাহী আর রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলায় এখন প্রায় ৪৪টি বগার কলোনি টিকে আছে। পুরো অঞ্চলের আয়তন বিবেচনায় নিলে এ সংখ্যা খুবই কম। বগার সংখ্যা এসব কলোনিতে অর্ধলাখের মতো। বগারা রাতের বেলা কলোনি করে থাকতে পছন্দ করে। বর্ষা মৌসুমে একসঙ্গে দলবদ্ধভাবে বাসা করে। কলোনিগুলোতে ৫০০ থেকে কয়েক হাজার পাখিও একসঙ্গে দেখা যায়। উত্তরবঙ্গ ছাড়া এ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আরও শতাধিক পাখি কলোনি আছে।

সারা দেশের পাখিশিকারিদের প্রধান লক্ষ্য বগা। পাবনার চলনবিলসহ বিভিন্ন বিলে প্রতিবছর বহু বগা শিকার হয়। বিষ প্রয়োগ ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে চলে এই শিকার। আবার কিছু কিছু পাখি কলোনি রক্ষায় সাধারণ মানুষ অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের মহেশখোলা গ্রামের এক গারো পাড়ায় গিয়েছিলাম এ রকম একটি কলোনি দেখতে। ভাবতে অবাক লাগে ওই পরিবারটিই বাস করে পাখির বাসার নিচে। বিষ্ঠা পড়ে ঘরের চালা নষ্ট হয়েছে। একমাত্র খাওয়ার পানির চাপকলটি ছাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়, যাতে পাখির বিষ্ঠা না পড়ে। মানুষ সচেতন হলে, ভালোবাসতে শিখলে এ রকম যেন নজির আরও তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন