বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কপ–২৬ কেন এবং সেখানে কী হবে

২০১৫ সালে জলবায়ুবিষয়ক আরেকটি বৈশ্বিক সম্মেলন হয়েছিল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। সেখানে যে চুক্তি হয়েছিল, সেটিকে তখন যুগান্তকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তাহলে গ্লাসগোর সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ যে মানবসৃষ্ট, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন মোটামুটি একমত। এর অন্যতম কারণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, যা এখনো ঊর্ধ্বমুখী। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। আমরা ঘন ঘন চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হচ্ছি। অতিবৃষ্টি, বন্যা, দাবদাহ, খরা, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমশৈলীর গলনের হার বৃদ্ধিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিপুলসংখ্যায় মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকা হারানোর কারণ হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার রেকর্ড বলছে, গত দশকে বিশ্বের তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ বেড়েছে এবং প্রতিবছরই তা নতুন নতুন মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে। এই পটভূমিতে জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা বদলানোর জন্য রাজনীতিকদের ওপর চাপ বাড়ছে।

২০১৫ সালে প্যারিসে যে চুক্তি হয়েছিল, তা প্রকৃত অর্থেই ঐতিহাসিক। কেননা চুক্তিটির আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চুক্তিতে সম্মত দেশগুলো একমত হয় যে চলতি শতকেই তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির মাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দেড় ডিগ্রির বেশি হতে দেবে না। ওই লক্ষ্য অর্জন ছাড়া বিপর্যয় এড়ানোর আর কোনো পথ নেই। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এখন যে হারে গ্রিনহাউস গ্যাসের উদ্‌গিরণ ঘটছে, তা বড় আকারে কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে নেট জিরো। এর অর্থ হচ্ছে, যতটা ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হচ্ছে, বায়ুমণ্ডল থেকে ঠিক ততটাই ক্ষতিকর গ্যাস অপসারণ করে ভারসাম্য আনা। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নেট জিরো অর্জনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

গ্লাসগোয় যে দুই শতাধিক দেশের নেতা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত হবেন, তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হবে, তাঁরা এই গ্যাস নির্গমন কমাতে কী করবেন। এখানে প্রতিটি দেশেরই স্বপ্রণোদিত জাতীয় পরিকল্পনা, যাকে বলা হচ্ছে ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি) তুলে ধরার কথা। ক্ষতিকর গ্যাস উদ্‌গিরণের শীর্ষে আছে যেসব দেশ, সেগুলোর মধ্যে চীন গত ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি বলে সম্মেলন সচিবালয় থেকে বলা হয়। কপ-২৬ সম্মেলনের সূচনায় দুদিনের যে শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা, তাতে চীনের প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিও তাই অনেককেই আশাহত করেছে।

গ্রিনহাউস গ্যাস উদ্‌গিরণ আরও কমানোর অঙ্গীকার প্রয়োজন

আসলে প্যারিস চুক্তিতেই প্রতি পাঁচ বছরে একবার করে চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ছিল। সেই আলোকেই গ্লাসগোর সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। গ্লাসগোর কপ-২৬-এর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য জাতিসংঘের আরেকটি তথ্য এখানে উল্লেখ করা যায়। জাতিসংঘ ২৬ অক্টোবর জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস উদ্‌গিরণ কমানোর যেসব পরিকল্পনা পাওয়া গেছে, তাতে তারা হিসাব করে দেখেছে, চলতি শতকের শেষে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের হার পরিকল্পিত দেড় ডিগ্রির জায়গায় ২ দশমিক ৭ ডিগ্রিতে দাঁড়াবে। যার মানে দাঁড়াচ্ছে, ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমানোর মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কম। সব দেশকে তাই এখন আরও বেশি মাত্রায় এই গ্যাস উদ্‌গিরণ কমাতে হবে।


ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমাতে যেসব পদক্ষেপের কথা গ্লাসগোয় শোনা যেতে পারে, সেগুলোর মধ্যে আছে:

● আরও দ্রুততম সময়ে কয়লাবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতার অবসান ঘটানো;

● নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো ও প্রযুক্তি সহজলভ্য করা;

● জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহন থেকে বিদ্যুচ্চালিত যানের প্রসার ঘটানো;

● গাছ কাটার পরিমাণ কমানো;

● উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে বাড়তি তহবিল জোগানো, যাতে বৈরী আবহাওয়ার ক্ষতি থেকে জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা যায়।

এর আগের ২৫টি জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক বাংলাদেশের সলীমুল হক। তিনি ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার–এ লিখেছেন, গ্লাসগোর শীর্ষ সম্মেলনে সরকারপ্রধানেরা যে অংশ নিচ্ছেন, তার মানে এই নয় যে তাঁরা কোনো নতুন চুক্তি করবেন। কপ হচ্ছে ইউএনএফসিসির সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিদের বার্ষিক বৈঠক, যেখানে তাঁরা চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে থাকেন। প্রথম সপ্তাহে সভায় অংশ নেন বিশেষজ্ঞ ও আমলারা, আর দ্বিতীয় সপ্তাহে যুক্ত হন মন্ত্রীরা, যেখানে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়ে থাকে। গ্লাসগোতেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটবে বলে মনে হয় না। তবে গ্লাসগোর আগে রোমে শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জোট জি–২০–এর যে বৈঠক হচ্ছে, সেখানে জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলার প্রশ্নে কোনো ঐকমত্য হলে কপ–২৬-এ তার প্রভাব দেখা যাবে।

জলবায়ুবিষয়ক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

গ্লাসগোয় দ্বিতীয় যে বিষয়টিতে মতানৈক্যের আলামত মিলেছে, তা হচ্ছে জলবায়ুবিষয়ক ন্যায়বিচার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দূষণের পরিমাণ শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপরীতে জনসংখ্যা বিবেচনায় মাথাপ্রতি অনেক কম। অতীত দূষণের সিংহভাগের দায়ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ, মালদ্বীপসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় বেশ কয়েকটি দেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এসব দেশের অনেকটাই, এমনকি পুরোটাই তলিয়ে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কাটানো এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের তহবিল প্রয়োজন। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা তা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতেও প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ। ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়েও তাই আছে টানাপোড়েন।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান উৎস শিল্পোন্নত দেশগুলো ২০০৯ সালে অঙ্গীকার করেছিল যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় তাদের বার্ষিক সাহায্যের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। ওইসিডির হিসাবে, সর্বশেষ ২০১৯ সালেও ধনী দেশগুলো দিয়েছে ৮০০ কোটি ডলার। আগের বছরগুলোয় এই পরিমাণ ছিল আরও কম। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর গ্রুপ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের বর্তমান চেয়ারপারসন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জলবায়ুবিষয়ক এক শীর্ষ বৈঠকেও ওই প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

তবে এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও কানাডা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা কার্যক্রমের অর্থায়নের যে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তা প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট হবে না বলেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নতুন পরিকল্পনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বার্ষিক সহায়তা ১০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করার সময়সীমা ২০২৩ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া অর্থায়নের ক্ষেত্রে দরিদ্র দেশগুলোতে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমানোর পদক্ষেপের চেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়ায় মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বলেছেন, এই ঘোষণা খুবই হতাশাজনক। তিনি বলেন, কপ–২৬–এর প্রতি আস্থা তৈরি ও গতি সঞ্চারের জন্য ১০ হাজার কোটি ডলার সাহায্যের অঙ্গীকার এখনই পূরণ করতে হবে, ২০২৩ পর্যন্ত অপেক্ষা নয়।

সাফল্য বা ব্যর্থতা বোঝা যাবে যেভাবে

স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য ২০৫০ সালের মধ্যে নেট জিরো বা ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন ও বায়ুমণ্ডল থেকে তা অপসারণে ভারসাম্য অর্জন এবং সেই লক্ষ্যে ২০৩০ সাল নাগাদ গ্যাস উদ্‌গিরণ কমানোয় সব দেশের বড় ধরনের অঙ্গীকার আশা করছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা দেড় ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর ব্যাপারে সমঝোতা না হলে সেটা হবে সম্মেলনের ব্যর্থতা। তবে কিছু কিছু বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদী বিশ্বাস করেন, বিশ্বনেতারা ইতিমধ্যেই অনেক দেরি করে ফেলেছেন এবং এখন কপ–২৬–এ যে সিদ্ধান্তই হোক না কেন, তাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দেড় ডিগ্রিতে আটকে রাখা আর সম্ভব হবে না।

এ ছাড়া আরেকটি আলোচিত মত হচ্ছে, কোভিডের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দা বা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সবুজ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সবুজ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা বলতে বিশেষজ্ঞরা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কথা বোঝান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্বের অগ্রসর অর্থনীতিগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ

গ্লাসগোয় সরকারি আয়োজনে যাঁরা আসবেন, বেসরকারি বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তার তুলনায় কোনো অংশেই কম হবে না। বেসরকারি আয়োজনগুলোর মধ্যে আছে ব্যবসায়ী এবং এনজিওগুলোর নানা সভা-সেমিনার। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়বেন পরিবেশবাদী আন্দোলনকারী। এদের সংখ্যা কত হাজার হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন। শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ, প্রতিবাদী গান-নাটক—নানা ধরনের আয়োজন দেখা যাবে।

কয়েক মাস ধরে লন্ডনে চলছে নাটকীয় প্রতিবাদ। ইনসুলেট ব্রিটেন নামের একটি গোষ্ঠীর সদস্যরা লন্ডনের প্রধান প্রবেশপথ এম২৫-এ নিজেদের রাস্তায় আঠা দিয়ে সেঁটে রেখে যান চলাচলে বাধা তৈরি করেছে। গ্রেপ্তার ও আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তারা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। তাদের দাবি, শীতকালে ঘরবাড়ি গরম রাখার জন্য গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার।

অতীতে এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন, গ্রিনপিসসহ বিভিন্ন সংগঠন লন্ডনের পাতালরেল ও গণপরিবহনে একই ধরনের নজরকাড়া কর্মসূচি পালন করেছে। গ্লাসগোয় তাই নাটকীয় কিছু ঘটার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না। স্কটল্যান্ডের পুলিশকে সহায়তা দিতে ব্রিটেনের অন্যান্য জায়গা থেকেও সেখানে শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে এসব বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন